
আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে ২-১ গোলে জিতে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। ১৬ জুলাই ২০২৬, বাংলাদেশ সময় ভোর রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে গেলেও ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ ও ৯০+২ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে আর্জেন্টিনা। দুটো গোলেই অ্যাসিস্ট করেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি।
ম্যাচের মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ম্যাচ | আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড |
| আসর | ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ |
| পর্ব | সেমিফাইনাল |
| ফলাফল | আর্জেন্টিনা ২ — ইংল্যান্ড ১ |
| ভেন্যু | মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম, আটলান্টা, জর্জিয়া |
| বাংলাদেশ সময় | ১৬ জুলাই ২০২৬, ভোর রাত ১টা (BST) — আটলান্টায় ছিল ১৫ জুলাই রাত |
| গোলদাতা | গর্ডন ৫৫’ (ENG); এনজো ফার্নান্দেজ ৮৫’, লাউতারো মার্তিনেজ ৯০+২’ (ARG) |
| অ্যাসিস্ট | লিওনেল মেসি (দুটো) |
| দর্শক | ৭১,৮৮৩ |
| রেফারি | ইসমাইল এলফাথ (আমেরিকা) |
| বিশ্বকাপে দুই দলের মুখোমুখি | ষষ্ঠবার |
| লাইভ চ্যানেল (বাংলাদেশ) | টি-স্পোর্টস, গাজী টিভি |
ম্যাচের আগের রাতে আটলান্টা যেন এক উৎসব নগরী
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড লাইভ খেলার আগের দিন থেকেই আটলান্টায় একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। শহরের প্রতিটি রেস্তোরাঁয়, প্রতিটি বারে মানুষ আর্জেন্টিনা না ইংল্যান্ড নিয়ে আলোচনায় মত্ত।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের বাইরে হাজার হাজার সমর্থক ম্যাচের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগে থেকে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা সংখ্যায় বেশি ছিলেন। আকাশি নীল ও সাদা জার্সিতে ভরে উঠেছিল পুরো এলাকা। তাদের গান, তাদের ঢোলক, তাদের স্লোগান শুনে মনে হচ্ছিল বুয়েনোস আইরেসের একটা টুকরো আটলান্টায় এসে পড়েছে।
ইংল্যান্ডের সমর্থকরা সাদা ও লাল জার্সিতে এসেছিলেন। “সুইট ক্যারোলাইন” আর “গড সেভ দ্য কিং” বাজছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চিৎকারের মাঝে সেই সুর একটু ঢাকা পড়ছিল।
ফিফা ও মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ম্যাচকে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ম্যাচ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। দুই দলের সমর্থকদের আলাদা গেটে প্রবেশ করানো হয়েছিল। নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এই উত্তেজনার পেছনে শুধু ফুটবল ছিল না। ছিল ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, ছিল ১৯৮৬-এর হ্যান্ড অব গডের ইতিহাস। দুই দেশের মধ্যে এই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক টানাপোড়েন মাঠের বাইরের উত্তেজনাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দুই দলের সেমিফাইনালে আসার পথ
আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের খেলার আগে দুই দল কোন পথে এখানে এসেছে, সেটা জানা দরকার।
আর্জেন্টিনার যাত্রা:
| পর্ব | প্রতিপক্ষ | ফলাফল | মেসির অবদান |
|---|---|---|---|
| গ্রুপ (আলজেরিয়া) | আলজেরিয়া | ৩-০ জয় | হ্যাটট্রিক |
| গ্রুপ (অস্ট্রিয়া) | অস্ট্রিয়া | ২-০ জয় | ১ গোল |
| গ্রুপ (জর্ডান) | জর্ডান | ৩-১ জয় | ২ অ্যাসিস্ট |
| শেষ বত্রিশ | কেপ ভার্দে | ৩-২ (AET) | ১ গোল |
| শেষ ষোলো | মিশর | ৩-২ | ১ গোল ১ অ্যাসিস্ট |
| কোয়ার্টার ফাইনাল | সুইজারল্যান্ড | ৩-১ | ১ অ্যাসিস্ট |
ইংল্যান্ডের যাত্রা:
| পর্ব | প্রতিপক্ষ | ফলাফল |
|---|---|---|
| গ্রুপ | ক্রোয়েশিয়া | ৪-২ জয় |
| গ্রুপ | ঘানা | ০-০ ড্র |
| গ্রুপ | পানামা | ২-০ জয় |
| শেষ বত্রিশ | ডিআর কঙ্গো | ২-১ জয় |
| শেষ ষোলো | মেক্সিকো | ৩-২ জয় |
| কোয়ার্টার ফাইনাল | নরওয়ে | ২-১ (AET) |
দুই দলের পথটা একটু ভিন্ন। আর্জেন্টিনা প্রতিটি নকআউট ম্যাচে কোনো না কোনোভাবে বিপদে পড়েছে এবং ফিরে এসেছে। ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছে, তুলনামূলক নিরাপদভাবে।
ম্যাচের একাদশ বিশ্লেষণ
ম্যাচ শুরুর আগে দুই কোচের একাদশ দেখে কৌশলের পার্থক্যটা বোঝা যাচ্ছিল।
আর্জেন্টিনার একাদশ (৪-৪-২):
| পজিশন | খেলোয়াড় |
|---|---|
| গোলরক্ষক | এমিলিয়ানো মার্তিনেজ |
| রাইট ব্যাক | নাহুয়েল মোলিনা |
| সেন্টার ব্যাক | ক্রিস্টিয়ান রোমেরো |
| সেন্টার ব্যাক | লিসান্দ্রো মার্তিনেজ |
| লেফট ব্যাক | নিকোলাস তাগলিয়াফিকো |
| মিড | জিওভান্নি সিমিওনে |
| মিড | লিয়ান্দ্রো পারেদেস |
| মিড | অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার |
| মিড | এনজো ফার্নান্দেজ |
| আক্রমণ | লিওনেল মেসি (অধিনায়ক) |
| আক্রমণ | হুলিয়ান আলভারেজ |
ইংল্যান্ডের একাদশ (৪-৩-৩):
| পজিশন | খেলোয়াড় |
|---|---|
| গোলরক্ষক | জর্ডান পিকফোর্ড |
| রাইট ব্যাক | রিস জেমস |
| সেন্টার ব্যাক | জন স্টোনস |
| সেন্টার ব্যাক | মার্ক গেহি |
| লেফট ব্যাক | ডিন স্পেন্স |
| মিড | ডেকলান রাইস |
| মিড | এলিয়ট অ্যান্ডারসন |
| মিড | মর্গান রজার্স |
| উইং | জুড বেলিংহাম |
| উইং | অ্যান্থনি গর্ডন |
| স্ট্রাইকার | হ্যারি কেইন (অধিনায়ক) |
কোচ স্কালোনি মেসিকে মুক্ত ভূমিকায় খেলাচ্ছিলেন, যেখানে তিনি মাঠের যেকোনো জায়গা থেকে বল নিতে পারছিলেন। টুখেল বেলিংহামকে আক্রমণে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, কেইনের পেছনে সৃজনশীল ভূমিকায়।
প্রথমার্ধ: রাস্তার লড়াইয়ের মতো কঠিন
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড লাইভ ম্যাচের শুরু থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, এটা কোনো সাদামাটা সেমিফাইনাল হবে না।
প্রথম ১০ মিনিট:
রেফারির বাঁশি বাজতেই দুই দল মাঝমাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ৩ মিনিটেই এনজো ফার্নান্দেজের কঠোর ট্যাকল। বাঁশি বাজলেন রেফারি ইসমাইল এলফাথ। কার্ড নেই, শুধু সতর্কতা।
৬ মিনিটে সিমিওনে ফাউল করে বসলেন এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে। ৯ মিনিটে রিস জেমসের কঠোর ট্যাকলে তাগলিয়াফিকো মাটিতে পড়লেন। রেফারি ফ্রি কিক দিলেন আর্জেন্টিনার পক্ষে। প্রথম ১০ মিনিটে ম্যাচ বারবার থামছে। শারীরিক লড়াই এমন তীব্র যে কোনো দলই মাঠে দীর্ঘ আক্রমণ গড়তে পারছে না।
১৩ মিনিটে উত্তাপ:
মাঝমাঠে পারেদেস দেরিতে ট্যাকল করলেন অ্যান্ডারসনকে। অ্যান্ডারসন উঠে দাঁড়িয়ে এনজো ফার্নান্দেজের দিকে এগিয়ে গেলেন। দুজনে মুখোমুখি হলেন। রেফারি দৌড়ে এলেন। বাকি খেলোয়াড়রাও ভিড় করলেন।
পরিস্থিতি অল্পের জন্য শান্ত হলো। কোনো কার্ড নেই, কিন্তু স্টেডিয়ামের পুরো পরিবেশ টান টান হয়ে গেল। এটা শুধু ফুটবল ম্যাচ না, দুই জাতির মধ্যে দশকের পুরনো উত্তেজনার একটা প্রকাশ।
২০ মিনিটে ইংল্যান্ডের সেরা সুযোগ:
রিস জেমস ডান প্রান্ত থেকে বক্সে নিচু ক্রস পাঠালেন। হ্যারি কেইন পজিশনে ছিলেন। কিন্তু এমিলিয়ানো মার্তিনেজ দ্রুত এগিয়ে এসে বলটা দুই হাতে নিরাপদে ধরলেন। আর্জেন্টিনা রক্ষা পেল।
২৫ মিনিটে হাইড্রেশন বিরতি:
আটলান্টার জুলাই মাসের গরম অসহ্য। মাঠের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। রেফারি হাইড্রেশন বিরতি দিলেন। দুই দলের খেলোয়াড়রা জল খেলেন, কোচদের নির্দেশনা নিলেন।
৩০-৪৫ মিনিট: কার্ডের পর কার্ড
৩৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার আক্রমণের চাপে মার্ক গেহি ফাউল করে বসলেন। ৩৭ মিনিটে এলিয়ট অ্যান্ডারসন মাঝমাঠে বাজে ফাউল করলেন। রেফারি পকেট থেকে হলুদ কার্ড বের করলেন। ইংল্যান্ডের প্রথম কার্ড।
৪২ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ মাঝমাঠে দেরিতে ট্যাকল করলেন। রেফারি দ্বিধা করলেন না। হলুদ কার্ড। এখন দুই দলেই একজন করে সতর্ক খেলোয়াড়।
৪৫+৩ মিনিটে বিরতি। স্কোর ০-০। কিন্তু ম্যাচের পরিবেশ বলছিল, গোল না হওয়াটাই হয়তো বড় খবর। এই দুই দল এভাবে খেলছে, যেন তারা জেতার চেয়েও হারতে ভয় পাচ্ছে বেশি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু: বেলিংহামের ট্যাকটিক্যাল চাপ
বিরতির পর ইংল্যান্ড পরিকল্পনা বদলাল। টুখেল আক্রমণে আরো সরাসরি হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
বেলিংহাম অনেক বেশি সক্রিয় হলেন। তিনি মাঝমাঠ থেকে এগিয়ে এসে গর্ডন ও কেইনের সাথে দ্রুত পাসের খেলায় আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে ফেললেন।
৫০ মিনিটে রাইসের দীর্ঘ পাস থেকে কেইন হেড করলেন। রোমেরো ক্লিয়ার করলেন। ৫২ মিনিটে গর্ডন ডান দিক থেকে একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢোকার চেষ্টা করলেন। তাগলিয়াফিকো তাকে থামালেন।
ইংল্যান্ড চাপ তৈরি করছিল। আর্জেন্টিনার রক্ষণ একটু টলছিল।
৫৫ মিনিট: গর্ডনের গোল, ইংল্যান্ড ১-০
এই মুহূর্তটা দেখতে কতটা সুন্দর ছিল।
মর্গান রজার্স মাঝমাঠে বল পেলেন। দ্রুত বাম দিকে ঘুরলেন। তিনি দেখলেন অ্যান্থনি গর্ডন ডান প্রান্তে একটু ফাঁকা। সেদিকে লম্বা পাস গেল।
গর্ডন বলটা বুকে নিলেন না, সরাসরি বক্সের দিকে দৌড়ালেন। রজার্স তখন চলতে চলতে ডানদিক থেকে ক্রস পাঠালেন পেনাল্টি স্পটের একটু বাইরে।
গর্ডন সেই বলে পা লাগালেন। মৃদু স্পর্শ, কিন্তু নিখুঁতভাবে দিকটা ঠিক। বল এমিলিয়ানো মার্তিনেজের বাম পাশ দিয়ে জালে ঢুকে গেল।
অফসাইডের পতাকা উঠল না। ভিএআর চেক হলো। গোল বহাল।
ইংল্যান্ড ১-০ এগিয়ে গেল।
স্টেডিয়ামের ইংলিশ সেকশনে বিস্ফোরণ ঘটল। বেলিংহাম দুই মুষ্টি শূন্যে তুলে চিৎকার করলেন। হ্যারি কেইন চোখ বুজে আকাশের দিকে তাকালেন।
আর্জেন্টিনার সমর্থকরা নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। মেসি মাথা নিচু করে মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আটলান্টার বাইরে, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যেসব আর্জেন্টিনার সমর্থক ভোর রাতে জেগে ছিলেন, তাদের হৃদয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।
৫৫-৮০ মিনিট: ইংল্যান্ডের প্রতিরক্ষার দুর্গ ও টুখেলের ভুল সিদ্ধান্ত
গোলের পর টুখেল একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, যা পরে তার ক্যারিয়ারের বড় সমালোচনার কারণ হবে।
তিনি দলকে রক্ষণে নামিয়ে আনলেন। বেলিংহামকে একটু পেছনে টানলেন। গর্ডনকে উইং ধরে রাখতে বললেন, আর এগিয়ে না যেতে। কেইন একা সামনে থাকলেন।
আর্জেন্টিনা বল নিয়ে ঘুরতে লাগল। কিন্তু ইংল্যান্ডের দুই সেন্টার ব্যাক স্টোনস ও গেহি অসাধারণ রক্ষণ করলেন। মেসি বারবার বল চাইলেন, কিন্তু স্পেস পাচ্ছিলেন না।
৬৫ মিনিটে মেসি বাম দিক থেকে সরু একটা গ্যাপ দিয়ে একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢুকলেন। স্টোনস শরীর দিয়ে ঠেকালেন। কর্নার হলো।
৭০ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ বাক্সে ঢুকে শট মারলেন। পিকফোর্ড অসাধারণ রিফ্লেক্সে বাঁচালেন।
৭৫ মিনিটে মেসির ফ্রি কিক দেওয়ালে আটকে গেল।
ইংল্যান্ড ধরে রাখছে। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে। ৮০ মিনিট হয়ে গেল। আর মাত্র ১০ মিনিট। বাংলাদেশের লাখো সমর্থকের বুকের ভেতর ভার জমছিল।
৮১ মিনিট: স্কালোনির সিদ্ধান্ত যা ম্যাচ বদলে দিল
স্কালোনি ডাগআউটে উঠে দাঁড়ালেন। সাবস্টিটিউশন বোর্ড উঠল। নম্বর ৯ লাউতারো মার্তিনেজ।
হুলিয়ান আলভারেজ মাঠ ছাড়লেন। তিনি জানতেন এই পরিস্থিতিতে একটা ক্লিনিক্যাল ফিনিশার দরকার। লাউতারো ইন্টার মিলানের হয়ে ক্লোজ রেঞ্জ গোলে যে দক্ষতা দেখান, আজ সেটাই কাজে লাগতে পারে।
লাউতারো মাঠে ঢুকলেন। মেসি তার দিকে তাকালেন। চোখে চোখ মিলল। কোনো কথা লাগল না।
৮৫ মিনিট: এনজো ফার্নান্দেজের বজ্রপাত
এই মুহূর্তটা পুরো আটলান্টাকে থামিয়ে দিল।
আর্জেন্টিনা একটা কর্নার পেল। মেসি শর্ট কর্নার নিলেন, ছোট পাস দিলেন বাক্সের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এনজো ফার্নান্দেজের পায়ে। এনজো গোল থেকে প্রায় ২০ মিটার দূরে বল পেলেন।
কোনো দ্বিধা করলেন না।
বাম পায়ে একটা শক্তিশালী, বাঁকানো শট মারলেন। বল পিকফোর্ডের নাগালের বাইরে দিয়ে জালে ঢুকে গেল। পিকফোর্ড আগের শটটা পাঞ্চ করে সরিয়েছিলেন, কিন্তু এবার পারলেন না।
১-১।
স্টেডিয়ামের আর্জেন্টিনা সেকশনে আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের মতো উল্লাস। মেসি দৌড়ে গেলেন এনজোর দিকে। দুজন জড়িয়ে ধরলেন একে অপরকে।
ইংল্যান্ডের সমর্থকরা হতবাক। স্টেডিয়ামে যে আর্জেন্টিনীয় শোরগোল উঠল, সেটা ইংলিশদের উদযাপন ডুবিয়ে দিল।
৯২ মিনিট: লাউতারো মার্তিনেজের ইতিহাস
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিট।
আর্জেন্টিনা আক্রমণে উঠল। ম্যাক অ্যালিস্টার বক্সের কাছ থেকে আরেকটা শট মারলেন, সেটা পোস্টে লেগে ফিরে এলো। মেসি সেই রিবাউন্ড বল সংগ্রহ করলেন ডান উইং থেকে।
তিনি দ্রুত মাথা তুলে দেখলেন বক্সের দূর পোস্টে লাউতারো পজিশন নিয়েছেন। মেসি ডান পা দিয়ে নিখুঁত লব ক্রস পাঠালেন।
লাউতারো লাফিয়ে উঠলেন। মাথা দিয়ে বলটা গোলের বাম পাশে ঠেলে দিলেন ক্লোজ রেঞ্জ থেকে। পিকফোর্ড একটুও নড়তে পারলেন না।
২-১ আর্জেন্টিনা।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম একটা অদ্ভুত মুহূর্তে ঢুকে গেল। অর্ধেক স্টেডিয়াম পাগলামি করছে, অর্ধেক স্তব্ধ।
লাউতারো মাঠের মাঝখানে দৌড়ে গেলেন। শার্ট খুলে ফেললেন। রেফারি হলুদ কার্ড দিলেন। কিন্তু লাউতারো পরোয়া করলেন না।
মেসি তার কাছে এলেন। দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। মেসির চোখে জল এলো।
লাউতারো পরে বললেন, “আমি কাঁদছি কারণ এটা অবিশ্বাস্য। এই দল প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে আসে। এটাই আমাদের পরিচয়।”
ম্যাচের পরিসংখ্যান
| তথ্য | আর্জেন্টিনা | ইংল্যান্ড |
|---|---|---|
| গোল | ২ | ১ |
| বলের দখল | ৪৮% | ৪৫% |
| মোট ফাউল | ১২ | ৭ |
| হলুদ কার্ড | ২ (লিসান্দ্রো, লাউতারো) | ১ (অ্যান্ডারসন) |
| শট | ১৫ | ৫ |
| শট অন টার্গেট | ৪ | ৩ |
| পাস সাফল্য | ৮১% | ৭৮% |
| কর্নার | ৩ | ৫ |
| ক্লিয়ারেন্স | ১১ | ১৪ |
| সেভ (গোলকিপার) | এমিলিয়ানো ৩ | পিকফোর্ড ৩+ |
| এক্সপেক্টেড গোল (xG) | ১.৮৪ | ০.৫৩ |
মেসির এই ম্যাচের মানে কী?
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড লাইভ ম্যাচ মেসির ক্যারিয়ারে একটা অসাধারণ পৃষ্ঠা যোগ করেছে।
এটা ছিল জাতীয় দলের হয়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মেসির প্রথম ম্যাচ। ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনা ও পিএসজিতে ইংলিশ ক্লাবের বিরুদ্ধে খেলেছেন, কিন্তু থ্রি লায়ন্সের বিরুদ্ধে কখনো সুযোগ হয়নি। ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, “সবার বিরুদ্ধে খেলেছি, শুধু ইংল্যান্ড বাদে। এটা আমার কাছে বিশেষ।”
বিশেষ হলোও। ম্যাচে গোল নেই মেসির। কিন্তু দুটো অ্যাসিস্ট, দুটো গোল যা ম্যাচের ফলাফল পাল্টে দিয়েছে।
মেসির এই বিশ্বকাপে এখন পরিসংখ্যান:
| পরিসংখ্যান | সংখ্যা |
|---|---|
| মোট ম্যাচ | ৭ |
| গোল | ৮ |
| অ্যাসিস্ট | ৫ |
| গোলে সম্পৃক্ততা | ১৩ |
| গোল্ডেন বুটে অবস্থান | যৌথ শীর্ষে (এমবাপ্পের সাথে) |
| মিনিট | ৫৬৩ |
এই সংখ্যাগুলো একজন ৩৯ বছর বয়সীর। ফুটবলে যে বয়সে সবাই অবসরে থাকেন।
ম্যাচ শেষে মেসি বললেন, “আমাদের সমর্থকরা এই জয়টা সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই সেমিফাইনালে কেউ হারতে চায়নি। ম্যাচটা কঠিন ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা পারলাম।”
এরপর একটু থামলেন। তারপর বললেন, “এই দলটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি এদের নিয়ে গর্বিত।”
বেলিংহামের চড় ও মাঠ পরবর্তী উত্তেজনা
আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড আজকের খেলার সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত এলো ম্যাচ শেষে।
লাউতারোর গোলে ম্যাচ শেষ হতেই আর্জেন্টিনার রিজার্ভ খেলোয়াড় ভ্যালেন্তিন বার্কো মাঠে নেমে উদযাপন করতে শুরু করলেন। বার্কো ইংল্যান্ডের বেঞ্চের সামনে দিয়ে দৌড়ে উল্লাস করলেন। এটা ইংলিশ কোচিং স্টাফকে উত্তেজিত করল।
জুড বেলিংহাম দূর থেকে দেখলেন। তার মুখে হতাশা, রাগ, ক্লান্তি সব একসাথে।
তিনি বার্কোর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার মাথার পেছনে চড় মারলেন।
স্পেনীয় সংবাদমাধ্যম ডিয়ারিও এএস-এর ক্যামেরা পুরো ঘটনা স্পষ্টভাবে ধরেছে। বেলিংহামকে সতীর্থরা ধরে সরিয়ে নিলেন। দুই পক্ষের খেলোয়াড়রা জড়িয়ে পড়লেন তর্কে।
এরপর বেলিংহাম মাঠ ছাড়লেন কাঁদতে কাঁদতে। পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেলেছেন। ৬ গোল করেছেন। আজ এই পরিস্থিতিতে তাকে দেখা খুব কষ্টের ছিল।
সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষক পল রবিনসন বিবিসি রেডিওতে বললেন, “আজকের পুরো ম্যাচে সুন্দর খেলাধুলার মনোভাব দেখা যায়নি। বেলিংহামের এটাই ছিল সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত।”
ফিফা এখন তদন্ত করছে। বেলিংহাম তৃতীয় স্থানের ম্যাচ খেলতে পারবেন কিনা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বার্কো কেন এমন করলেন, সেটাও আলোচনায় এসেছে। যদি তিনি সত্যিই ইংল্যান্ডের বেঞ্চের সামনে উদযাপন করে থাকেন, সেটাও খেলাধুলার স্পিরিটের বিরুদ্ধে।
ফকল্যান্ড ব্যানার: রাজনীতি মাঠে এলো
আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের খেলার পর আরেকটি বিতর্ক জন্ম নিল।
ম্যাচ শেষে জিওভান্নি লো সেলসো, যিনি আজকের ম্যাচে মাঠে খেলেননি, একটা সাদা ব্যানার বের করলেন। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল, “লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস।” মানে হলো, “মালভিনাস আমাদের।”
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টিনায় ‘মালভিনাস’ বলা হয়। ১৯৮২ সালে এই দ্বীপপুঞ্জের দখল নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়েছিল।
নিকোলাস ওটামেন্ডি ও দলের অনেক সদস্য সেই ব্যানারটি হাতে তুললেন। গ্যালারিতেও একই ব্যানার দেখা গেল।
ফিফার নিয়ম স্পষ্ট। মাঠে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বার্তা, ব্যানার বা স্লোগান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই লঙ্ঘনের জন্য আর্জেন্টিনাকে শাস্তি দেওয়া হতে পারে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনাল মাত্র তিন দিন পরে। মেসির শেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বহিষ্কার করলে ফিফার বাণিজ্যিক ক্ষতি হবে বিশাল। তাই আর্থিক জরিমানা বা কড়া সতর্কতায় বিষয়টা মিটিয়ে নেওয়া হবে বলে ধারণা।
আর্জেন্টিনার নীল জার্সির ইতিহাস ও কুসংস্কার
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড লাইভ ম্যাচে আর্জেন্টিনা তাদের চিরচেনা সাদা-নীল স্ট্রাইপড জার্সির বদলে গাঢ় নীল জার্সি পরেছিল।
কেন? কারণ এই নীল জার্সিতে আর্জেন্টিনা ইতিহাসের দুটো সেরা মুহূর্ত তৈরি করেছে।
১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে, ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড ও গোল অব দ্য সেঞ্চুরির রাতে, আর্জেন্টিনা নীল জার্সি পরেছিল।
১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে, পেনাল্টি শুটআউটে বেকহ্যামের দল ইংল্যান্ডকে হারানোর রাতেও নীল জার্সি।
এবার ২০২৬-এ আটলান্টায় ফের নীল জার্সি। ফের ইংল্যান্ড। ফের আর্জেন্টিনার জয়।
টুখেল ম্যাচের আগের দিন এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “যদি কোনো কুসংস্কার কাজে লাগত, আমিও তাই করতাম।” জার্সির রং কি সত্যিই ম্যাচে প্রভাব ফেলে, সেটা বিজ্ঞান জানে না। কিন্তু ইতিহাস তিনবার একই কথা বলেছে।
ইতিহাসের আয়নায় আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড
ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাস শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের গল্প না। এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, রাজনীতি, বিতর্ক আর আবেগের এক জটিল মিশ্রণ।
বিশ্বকাপে দুই দলের সমস্ত মুখোমুখি:
| বছর | ভেন্যু | পর্ব | ফলাফল | মূল ঘটনা |
|---|---|---|---|---|
| ১৯৬২ | রান্কাগুয়া, চিলি | গ্রুপ | ইংল্যান্ড ৩-১ | দুই দলের প্রথম বিশ্বকাপ দেখা |
| ১৯৬৬ | ওয়েম্বলি, ইংল্যান্ড | কোয়ার্টার | ইংল্যান্ড ১-০ | রাতোনের লাল কার্ড বিতর্ক |
| ১৯৮৬ | আজতেকা, মেক্সিকো | কোয়ার্টার | আর্জেন্টিনা ২-১ | হ্যান্ড অব গড + গোল অব দ্য সেঞ্চুরি |
| ১৯৯৮ | সেন্ট-এতিয়েন, ফ্রান্স | শেষ ষোলো | আর্জেন্টিনা ৪-৩ পেনা. | বেকহ্যামের লাল কার্ড |
| ২০০২ | সাপ্পোরো, জাপান | গ্রুপ | ইংল্যান্ড ১-০ | বেকহ্যামের পেনাল্টি গোল |
| ২০২৬ | আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র | সেমিফাইনাল | আর্জেন্টিনা ২-১ | মেসির ইতিহাস |
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন ৩ জয় করে সমান আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। তবে নকআউটে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত কখনো হারেনি।
মেসি বনাম কেইন: দুই অধিনায়কের তুলনা
আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের খেলায় দুই অধিনায়কের পারফরম্যান্স ছিল বৈপরীত্যের গল্প।
| তুলনা | লিওনেল মেসি | হ্যারি কেইন |
|---|---|---|
| বয়স | ৩৯ | ৩২ |
| আজকের গোল | ০ | ০ |
| আজকের অ্যাসিস্ট | ২ | ০ |
| এই টুর্নামেন্টে গোল | ৮ | ৬ |
| এই টুর্নামেন্টে অ্যাসিস্ট | ৫ | ৩ |
| জাতীয় দলে মোট গোল | ১০৯ | ৬৬ |
| আন্তর্জাতিক ক্যাপ | ১৯৫ | ১২১ |
| বিশ্বকাপ শিরোপা | ১ (২০২২) | ০ |
মেসি গোল না করেও ম্যাচ জেতালেন। কেইন গোল করলেন না, কিন্তু দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সারাটা ম্যাচ।
দুজনের কেউই হতাশ করেননি সমর্থকদের। কিন্তু মেসির দুটো অ্যাসিস্ট আজ রাতের সেরা পারফরম্যান্স।
কেইন ম্যাচ শেষে বললেন, “আমরা হার মেনে নিচ্ছি না। আমরা আবার আসব।” তার চোখে ছিল বেদনা, কিন্তু গলায় ছিল সংকল্প।
স্কালোনির অলৌকিক দল: চার নকআউটে চার প্রত্যাবর্তন
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার একটাই পরিচয় হয়ে গেছে। তারা হারে না, শুধু দেরি করে জেতে।
চার নকআউট ম্যাচে চারটি ভিন্ন রকম বিপদ থেকে ফিরে আসা:
- রাউন্ড অব ৩২: কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গেল, আর্জেন্টিনা ৩-২ জিতল
- রাউন্ড অব ১৬: মিশর ২-০ এগিয়ে গেল, আর্জেন্টিনা ৩-২ তে জিতল
- কোয়ার্টার ফাইনাল: সুইজারল্যান্ড ১০ জনে খেলেও চাপ দিয়ে রাখল, জিতল ৩-১
- সেমিফাইনাল: ইংল্যান্ড ৮০ মিনিট ১-০ এগিয়ে, আর্জেন্টিনা শেষ ১০ মিনিটে ২-১
স্কালোনি বললেন, “আমি বাকহীন। এই খেলোয়াড়রা আমাকে প্রতিবার অবাক করেন। আমরা সত্যিই অনন্য।”
বিশ্বকাপে এই ধরনের প্রত্যাবর্তনের রেকর্ড কারো নেই। স্কালোনির দল একটা নতুন অধ্যায় লিখছে।
টুখেলের হতাশা এবং ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের দীর্ঘশ্বাস
১৯৬৬ সালের ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ড শেষবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর ৬০ বছর। প্রতিটি বিশ্বকাপে একই স্বপ্ন, একই হতাশা।
এবারের ইংল্যান্ড দল সম্ভবত গত ৩০ বছরের সেরা। বেলিংহাম, কেইন, সাকা, ফোডেন, রাইস। অভিজ্ঞ কোচ টুখেল। সেমিফাইনাল পর্যন্ত এসে থেমে গেল।
টুখেলের রক্ষণাত্মক কৌশলের সমালোচনা করলেন ইংলিশ কিংবদন্তিরা। সাবেক স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার টুইট করলেন, “১-০ এগিয়ে থেকে আত্মরক্ষায় যাওয়া একটাই ফলাফল দেয়, এবং সেটা আজ দেখলাম।”
টুখেল নিজেই স্বীকার করলেন, “হারের ব্যবধান আরো বেশি হতে পারত। এটা বলতে কষ্ট লাগছে কিন্তু এটাই সত্য।”
ইংল্যান্ড এখন শনিবার তৃতীয় স্থানের ম্যাচে ফ্রান্সের সাথে লড়বে। এটা মনোতুষ্টি কম, কিন্তু দলকে একটা সমাপ্তি দেবে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনার রাতে উৎসব
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড লাইভ খেলা বাংলাদেশের লাখো মানুষ দেখলেন ভোর রাতে জেগে।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক বিশাল। প্রতিটি বিশ্বকাপে হলুদ-নীল জার্সি পরে রাস্তায় নামেন এই দেশের মানুষ। ৯২ মিনিটে লাউতারোর গোলের পর কিছু শহরে আনন্দে আতশবাজি ফোটার খবরও পাওয়া গেছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের অনেক জায়গায় তরুণরা রাস্তায় নেমেছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সি পরে।
টি-স্পোর্টস ও গাজী টিভিতে ম্যাচটির লাইভ সম্প্রচার হয়েছে। অনলাইনে টফি অ্যাপ, বায়োস্কোপ ও মাই রবি অ্যাপেও দেখার সুযোগ ছিল।
আর্জেন্টিনা vs স্পেন: ফাইনালের পূর্বাভাস
১৯ জুলাই ২০২৬। ফাইনাল হবে নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে (টুর্নামেন্টে যেটি নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম নামে পরিচিত)।
আর্জেন্টিনার সামনে প্রতিপক্ষ স্পেন। স্পেন ১৪ জুলাই ফ্রান্সকে ২-০ হারিয়ে ফাইনালে এসেছে।
এই ম্যাচে থাকবে:
- মেসি বনাম ইয়ামাল: ৩৯ বছরের সেরা বনাম ১৭ বছরের ভবিষ্যৎ
- আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য মনোবল বনাম স্পেনের সুশৃঙ্খল দলীয় ফুটবল
- আর্জেন্টিনার রাস্তার লড়াই বনাম স্পেনের ৬২% বল দখলের কৌশল
| তুলনা | আর্জেন্টিনা | স্পেন |
|---|---|---|
| গোল (এই টুর্নামেন্ট) | ১৯ | ১৩ |
| গোল খাওয়া | ৮ | ২ |
| সেমিফাইনাল জয় | ২-১ (ইংল্যান্ড) | ২-০ (ফ্রান্স) |
| মূল তারকা | মেসি (৮ গোল, ৫ অ্যাসিস্ট) | ইয়ামাল (৩ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট) |
| কোচ | স্কালোনি | দে লা ফুয়েন্তে |
আর্জেন্টিনা যদি ফাইনাল জেতে, ব্রাজিলের (১৯৫৮-৬২) পর ৬৪ বছরে প্রথম টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতা দল হবে তারা। এই রেকর্ড পেলের দলও গড়েছিল। এখন মেসির দলের সুযোগ।
স্পেন জিতলে ১৬ বছর পর দ্বিতীয় শিরোপা।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড আজকের খেলার ফলাফল কী?
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড আজকের খেলায় আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জিতেছে। ইংল্যান্ডের হয়ে অ্যান্থনি গর্ডন ৫৫ মিনিটে গোল করেন। আর্জেন্টিনার হয়ে এনজো ফার্নান্দেজ ৮৫ মিনিটে ও লাউতারো মার্তিনেজ ৯২ মিনিটে গোল করেন। দুটো গোলেই মেসি অ্যাসিস্ট করেছেন।
আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড লাইভ ম্যাচ কোথায় ও কখন হয়েছে?
আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড লাইভ সেমিফাইনাল ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় ১৬ জুলাই ২০২৬ ভোর রাত ১টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভেন্যু যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম। আটলান্টার স্থানীয় সময়ে ম্যাচটি ছিল ১৫ জুলাই রাতে, তবে বাংলাদেশে (BST UTC+6) সেটি পড়ে ১৬ জুলাই ভোর রাত ১টায়।
বেলিংহাম কেন বার্কোকে চড় মেরেছিলেন?
আর্জেন্টিনার রিজার্ভ ভ্যালেন্তিন বার্কো ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের বেঞ্চের সামনে উল্লাস করেছিলেন বলে জানা যায়। সেটা দেখে উত্তেজিত বেলিংহাম বার্কোর মাথার পেছনে চড় মেরেছেন। ডিয়ারিও এএসের ক্যামেরায় পুরো ঘটনা ধরা পড়েছে। ফিফা তদন্ত করছে।
ফকল্যান্ড ব্যানার নিয়ে কী হবে?
আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা জিওভান্নি লো সেলসো ও নিকোলাস ওটামেন্ডির নেতৃত্বে “লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস” লেখা রাজনৈতিক ব্যানার দেখিয়েছেন। এটা ফিফার নিয়মের লঙ্ঘন। তবে ফাইনাল তিন দিন পরে হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আর্থিক জরিমানায় বিষয়টা মিটে যাবে।
মেসি কি আগে কখনো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলেছেন?
না। আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড আজকের খেলাটাই ছিল ৩৯ বছর বয়সী মেসির ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ। ক্লাব ফুটবলে ইংলিশ ক্লাবের বিরুদ্ধে খেলেছেন অনেকবার, কিন্তু জাতীয় দলে এটাই প্রথম। মেসি নিজেই ম্যাচের আগে এটাকে বিশেষ মুহূর্ত বলেছিলেন।
আর্জেন্টিনার নীল জার্সির কারণ কী?
আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক দুটো জয়ে (১৯৮৬ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপ) গাঢ় নীল জার্সি পরেছিল। সেই কুসংস্কারেই এবারও নীল জার্সি বেছে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এবারও সেই নীল জার্সিতে ইংল্যান্ডকে হারাল তারা। তিনটি বিশ্বকাপে তিনটি জয় নীল জার্সিতে।
আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপ ফাইনালে টানা দ্বিতীয়বার জিততে পারবে?
আর্জেন্টিনার ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্পেন। ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল। আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিলের (১৯৫৮-৬২) পর ৬৪ বছরে প্রথমবার কোনো দল টানা দুটো বিশ্বকাপ জিতবে। মেসির নেতৃত্ব ও দলের মনোবল আর্জেন্টিনাকে ফেবারিটে রাখছে।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড এর আগে কতবার মুখোমুখি হয়েছে?
ফিফা বিশ্বকাপে দুই দল মোট ছয়বার মুখোমুখি হয়েছে। তিনটি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও তিনটিতে ইংল্যান্ড জিতেছে। তবে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা তিনবারের (১৯৮৬, ১৯৯৮, ২০২৬) তিনবারই জিতেছে।
উপসংহার: এই রাত ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল
আর্জেন্টিনা vs ইংল্যান্ড আজকের খেলা শুধু একটা সেমিফাইনাল ম্যাচ ছিল না।
এটা ছিল দুই মহাশক্তির ৪০ বছরের প্রতিহিংসার আরেকটা অধ্যায়। এটা ছিল ম্যারাডোনার ছায়ায় বড় হওয়া একটা জাতির ফুটবলের জন্য ভালোবাসার প্রকাশ। এটা ছিল ৩৯ বছর বয়সী একজন মানুষের শেষ বিশ্বকাপে আরেকটা অবিশ্বাস্য মুহূর্ত তৈরি করার গল্প।
৮৫ মিনিটে এনজোর শট যখন জালে ঢুকল, স্টেডিয়ামে সেই শব্দ মনে হচ্ছিল বজ্রপাত। ৯২ মিনিটে লাউতারোর হেড যখন গোল হলো, সারা আটলান্টা কেঁপে উঠল। আর বাংলাদেশের রাস্তায় ভোর রাতে যেসব মানুষ উল্লাসে বেরিয়ে পড়লেন, তারা শুধু গোলের উদযাপন করেননি। তারা উদযাপন করেছেন ফুটবলকে, মেসিকে, সেই অনুভূতিকে যা শুধু বিশ্বকাপই দিতে পারে।
বেলিংহামের চড়, ফকল্যান্ড ব্যানার, এসব বিতর্ক আছে। কিন্তু মাঠের ভেতরের গল্পটাই মনে থাকবে। এনজোর দীর্ঘপাল্লার শট। লাউতারোর মাথা। মেসির দুটো অ্যাসিস্ট।
১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে স্পেন। মেসির শেষ বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ। এই রাতের মতো আরেকটা রাত আসবে কিনা জানা নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনা এই মুহূর্তে বিশ্বাস করে, তারা পারবে।
এই রোমাঞ্চের ভেতরে থাকতে এখনই Jeta33-এ যোগ দিন। ফাইনালের আগে Jeta33-এর প্রমোশন পেজ দেখুন।