
গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে? ফ্রান্স ও রিয়েল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন, ইতিহাসে প্রথমবার কেউ দ্বিতীয়বার এই পুরস্কার পেলেন। গোল্ডেন বল পেয়েছেন স্পেনের রদ্রিগো, গোল্ডেন গ্লাভ পেয়েছেন উনাই সিমন, আর সেরা তরুণ খেলোয়াড় হয়েছেন পাও কুবারসি। ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সব পুরস্কার: এক নজরে
| পুরস্কার | বিজয়ী | দেশ | বিবরণ |
|---|---|---|---|
| গোল্ডেন বুট | কিলিয়ান এমবাপ্পে | ফ্রান্স | ১০ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট |
| গোল্ডেন বল | রদ্রি | স্পেন | সেরা খেলোয়াড় |
| গোল্ডেন গ্লাভ | উনাই সিমন | স্পেন | ৭টি ক্লিন শিট (বিশ্বকাপ রেকর্ড) |
| সেরা তরুণ খেলোয়াড় | পাও কুবারসি | স্পেন | ১৭ বছর |
| সিলভার বল | লিওনেল মেসি | আর্জেন্টিনা | ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট |
| ব্রোঞ্জ বল | কিলিয়ান এমবাপ্পে | ফ্রান্স | ১০ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট |
| বিশ্বচ্যাম্পিয়ন | স্পেন | — | ১-০ (AET) আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে |
গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে এবং কেন এটা এত বিশেষ?
গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর হলো কিলিয়ান এমবাপ্পে। কিন্তু শুধু জেতাটাই বিশেষ নয়, বিশেষ হলো কীভাবে জিতলেন।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন, ৮ গোল করে। এবার ২০২৬-এ ১০ গোল। একই খেলোয়াড় পরপর দুটো বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতলেন, ফুটবলের ইতিহাসে এটা আগে কখনো হয়নি।
কিন্তু আরো বড় কথা হলো, এমবাপ্পে ১০ গোল করে ইতিহাসে মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হলেন যিনি একটি বিশ্বকাপে দুই সংখ্যার গোল করেছেন। এর আগে এই কাজ করেছিলেন শুধু পেলে (১৯৫৮ সালে অনেক বেশি), হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোসিস (১৯৫৪), ফ্রান্সের জাস্ট ফন্তাইন (১৯৫৮) এবং পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার (১৯৭০ সালে ১০ গোল)। গার্ড মুলারের পর ৫৬ বছরে প্রথমবার কেউ একটি বিশ্বকাপে ১০ গোল করলেন।
তৃতীয় স্থানের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোল করে এমবাপ্পে মেসির (৮ গোল) চেয়ে এগিয়ে গেলেন। আরো বড় অর্জন, এই গোলগুলো করে এমবাপ্পে বিশ্বকাপের সর্বকালীন সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন, মেসিকে পেছনে ফেলে।
গোল্ডেন বল কে পেল? রদ্রির অনন্য অর্জন
গোল্ডেন বল কে পেল এই প্রশ্নের উত্তরে স্পেনের রদ্রির নাম আসতে পারে অনেকের কাছে চমক হিসেবে। কারণ তিনি না গোল করেছেন অনেক, না অ্যাসিস্ট করেছেন বেশি।
তাহলে কেন রদ্রি?
কারণ স্পেনের এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন গোটা টুর্নামেন্টে লা রোহার মেরুদণ্ড। তার বল দখল করার ক্ষমতা, মাঠের মাঝখানে প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর দক্ষতা এবং স্পেনের খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতুলনীয় ছিল।
স্পেন এই বিশ্বকাপে মাত্র ১টি গোল খেয়েছে পুরো টুর্নামেন্টে। ৭টি ক্লিন শিট রেখেছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনা নর্মাল টাইমে একটাও শট নিতে পারেনি। এই কাজটা সম্ভব হয়েছে রদ্রির কারণে।
২০২৪ সালে রদ্রি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। এবার বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল। এটা তার ক্যারিয়ারের সেরা বছরের পোস্টার।
ফিফার বিশেষজ্ঞ প্যানেল রদ্রিকে বেছে নিয়েছে মেসি ও এমবাপ্পের উপরে। মেসি সিলভার বল পেয়েছেন, এমবাপ্পে ব্রোঞ্জ।
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনাল ২০২৬: যে রাতের গল্প সবাই বলবে
১৯ জুলাই ২০২৬। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ফাইনাল শুরু হলো।
একদিকে আর্জেন্টিনা, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ৩৯ বছরের মেসি, সম্ভবত তার শেষ বিশ্বকাপ। টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতার স্বপ্ন।
অন্যদিকে স্পেন, ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়ন। গোটা টুর্নামেন্টে অপরাজিত। ইয়ামালের মতো ১৭ বছরের বিস্ময়।
৮০,০০০ দর্শক সে রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে। বাংলাদেশের লাখো সমর্থকও সেই রাতে ঘুম দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা লাইভ: ফাইনালের মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ম্যাচ | স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা |
| আসর | ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফাইনাল |
| ফলাফল | স্পেন ১ — আর্জেন্টিনা ০ (অতিরিক্ত সময়ে) |
| ভেন্যু | মেটলাইফ স্টেডিয়াম, ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি |
| বাংলাদেশ সময় | ২০ জুলাই ২০২৬, ভোর রাত |
| গোলদাতা | ফেরান তোরেস (১০৬’, স্পেন) |
| লাল কার্ড | এনজো ফার্নান্দেজ (৯০+৩’, ARG) — দ্বিতীয় হলুদ |
| দর্শক | ৮০,০০০+ |
| আর্জেন্টিনার শট (নর্মাল টাইম) | ০ (বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথমবার) |
| এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেভ | ১১ (ফাইনালের রেকর্ড) |
| স্পেনের মোট শট | ২০ |
ম্যাচের মূল মুহূর্তগুলো
প্রথমার্ধ: স্পেনের আধিপত্য, আর্জেন্টিনার রক্ষণ
৫ মিনিটে ইয়ামাল প্রথম শট মারলেন। স্পেন শুরু থেকেই বল দখল রাখল।
৩৯ মিনিটে ওয়ারজাবালের শট মারলেন সরাসরি এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দিকে। বড় বিপদ হলো না।
আর্জেন্টিনা পুরো প্রথমার্ধে একটাও শট মারতে পারলো না। মেসিকে মাঠের কোনে সীমাবদ্ধ করে রাখল স্পেনের মাঝমাঠ।
৭৭ মিনিটে ওলমো ও কুবারসি দুটো সুযোগ পেলেন। এমিলিয়ানো দুটোই বাঁচালেন। গোলরক্ষকের এই পারফরম্যান্স রেকর্ড বই খুলছিল।
৯০+৩ মিনিট: এনজোর লাল কার্ড, ম্যাচের মোড় বদল
এই মুহূর্তটাই ফাইনালের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিল।
নর্মাল টাইমের শেষে এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেলেন পাও কুবারসিকে ফাউল করার জন্য। আগে একটা হলুদ ছিলই, এবারের ফাউলটা রেফারি ছাড়লেন না। লাল কার্ড।
আর্জেন্টিনা ১০ জনে হলো। এই পরিস্থিতিতে আর কোনো পথ ছিল না। স্পেনকে একটা গোলও করতে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু ১০ জনে খেলা সহজ না।
৯০+৯ মিনিট: ইয়ামালের শট, এমিলিয়ানোর অবিশ্বাস্য সেভ
নর্মাল টাইমের শেষ মুহূর্তে ইয়ামাল ফ্রি কিক থেকে শক্তিশালী শট মারলেন। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ অসাধারণ সেভ করলেন।
স্কোরলাইন ০-০ নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে গেল ম্যাচ।
৯৬ মিনিট: উইলিয়ামসের গোল বাতিল
৯৬ মিনিটে স্পেন উইলিয়ামস নেটে বল জড়ালেন। মনে হলো গোল হয়ে গেল। কিন্তু ভিএআর চেক হলো। মেরিনো বিল্ডআপে ওটামেন্ডির পায়ে ছুঁয়েছিলেন, অফসাইড। বাতিল।
স্পেন আরো হতাশ হলো। কিন্তু থামলো না।
১০৬ মিনিট: ফেরান তোরেসের ঐতিহাসিক গোল
এই গোলটা ফুটবল ইতিহাসে যুগযুগ ধরে মনে থাকবে।
স্পেন ১০ জনের আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আক্রমণ করে গেল। তোরেস বাক্সে ঢুকলেন। বল পেলেন ক্লোজ রেঞ্জে। শক্তিশালী শটে বল পাঠালেন জালের উপরের কোণে।
এমিলিয়ানো এবার কিছু করতে পারলেন না।
১-০ স্পেন। ১০৬ মিনিটে। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম মিনিটে।
তোরেস নিজেই পরে বলেছেন, “এই গোল ছিল ৪৭ মিলিয়ন স্পেনীয়র। এটা শুধু আমার না বা ২৬ জন খেলোয়াড়ের না। ভাগ্য লেখা ছিল, জয়ী হওয়ার জন্য।”
তোরেস বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সাবস্টিটিউট হলেন যিনি ফাইনালে জয়সূচক গোল করলেন। আগে ২০১৪ সালে জার্মানির মারিও গোটজে এটা করেছিলেন, সেবারও প্রতিপক্ষ ছিল আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনার শূন্য শটের রহস্য
ফাইনালের সবচেয়ে আলোচিত পরিসংখ্যান হলো আর্জেন্টিনার নর্মাল টাইমে শূন্য শট।
বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে কোনো দল এর আগে ৯০ মিনিটে একটাও শট না মেরে শেষ করেনি। অপটার রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৬৬-এর পর থেকে এটা প্রথম এবং একমাত্র ঘটনা।
মেসির প্রথম শট এলো ১১৭ মিনিটে। তখন দল ইতিমধ্যে ১০ জনে।
কেন আর্জেন্টিনা শট নিতে পারলো না? কারণ রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের মিডফিল্ড ব্লকেড এত শক্তিশালী ছিল যে মেসির কাছে বল পৌঁছানোর রাস্তাই বন্ধ ছিল। মেসি পুরো ম্যাচে মাত্র ৫৪ বার বল স্পর্শ করেছেন।
ম্যাচের পরিসংখ্যান: সংখ্যায় ফাইনাল
| তথ্য | স্পেন | আর্জেন্টিনা |
|---|---|---|
| মোট শট | ২০ | ১ (১১৭ মিনিটে) |
| নর্মাল টাইমে শট | ২০ | ০ |
| বল দখল | ৫৭% | ৪৩% |
| পাস সাফল্য | ৮৮% | ৮০% |
| ক্লিন শিট (টুর্নামেন্ট) | ৭ | — |
| এমিলিয়ানোর সেভ | — | ১১ (ফাইনালের রেকর্ড) |
| লাল কার্ড | ০ | ১ (এনজো) |
| পোস্টম্যাচ হলুদ কার্ড | পারেদেস (পোস্টম্যাচ বিবাদে) | — |
গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে: এমবাপ্পের ১০ গোলের সম্পূর্ণ তালিকা
এমবাপ্পে বিশ্বকাপ ২০২৬-এ ১০ গোল করেছেন। কোন ম্যাচে কোন গোল:
| ম্যাচ | পর্ব | গোল |
|---|---|---|
| ফ্রান্স বনাম সেনেগাল | গ্রুপ | ২ গোল (জয় ৩-১) |
| ফ্রান্স বনাম ইরাক | গ্রুপ | ২ গোল (জয় ৩-০) |
| ফ্রান্স বনাম নরওয়ে | গ্রুপ | ০ গোল (জয় ৪-১) |
| ফ্রান্স বনাম সুইডেন | রাউন্ড অব ৩২ | ২ গোল (জয় ৩-০) |
| ফ্রান্স বনাম প্যারাগুয়ে | শেষ ষোলো | ১ গোল (জয় ১-০) |
| ফ্রান্স বনাম মরক্কো | কোয়ার্টার | ১ গোল (জয় ২-০) |
| ফ্রান্স বনাম স্পেন | সেমিফাইনাল | ০ গোল (হার ০-২) |
| ফ্রান্স বনাম ইংল্যান্ড | তৃতীয় স্থান | ২ গোল (হার ৪-৬) |
| মোট | ১০ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট |
ফ্রান্স চতুর্থ হলেও এমবাপ্পে ব্যক্তিগতভাবে অসাধারণ। দলের হারের যন্ত্রণার মাঝেও গোল্ডেন বুট তার হাতে।
মেসির শেষ বিশ্বকাপ: ৮ গোল, ১টি শিরোপা
গোল্ডেন বুট না পেলেও মেসির এই বিশ্বকাপ ভুলবার নয়।
৩৯ বছর বয়সে তিনি টুর্নামেন্টে ৮ গোল করেছেন। ৪টি অ্যাসিস্ট দিয়েছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুটো অ্যাসিস্টে দল ২-১ জিতিয়েছিলেন।
কিন্তু ফাইনালে মেসি যেন নিজেকে খুঁজে পেলেন না। স্পেনের রক্ষণ তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। মাত্র ৫৪ বার বল স্পর্শ করলেন। একটাও শট অন টার্গেট নেই।
শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি হাঁটু গেড়ে মাঠে বসে পড়লেন। চোখে জল। স্পেন যখন উদযাপন করছে, মেসি স্টেডিয়ামের মাঠে একা।
পুরস্কার বিতরণীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে মেসির গলায় পদক পরিয়ে দিলেন। মেসি মাঠে ফিরে দর্শকদের দিকে তাকালেন। তখন আর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না।
মেসির মোট বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান এখন অবিশ্বাস্য। ২৬টি গোল, ১৮টি অ্যাসিস্ট, ২৬টি ম্যাচ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান।
তবে এমবাপ্পে এই টুর্নামেন্টে মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের সর্বকালীন সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন।
গোল্ডেন বল কে পেল? রদ্রির সেরা হওয়ার গল্প
গোল্ডেন বল কে পেল জানতে অনেকে অবাক হয়েছেন। কারণ টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পে গোল্ডেন বল পাননি, পেয়েছেন গোল্ডেন বুট।
রদ্রির গোল্ডেন বল পাওয়াটা কি ন্যায্য?
তার পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায়। রদ্রির কারণেই স্পেন এত সংগঠিত ছিল। প্রতিটি ম্যাচে তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণের নাড়ি ধরে রেখেছেন। ফাইনালে মেসি একটাও শট মারতে পারেননি, এর পেছনে বড় অবদান রদ্রির পজিশনিং।
ম্যাঞ্চেস্টার সিটির এই স্পেনীয় মিডফিল্ডার ২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। এবার বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল। এটা তার ক্যারিয়ারকে সংজ্ঞায়িত করল।
রদ্রি নিজে বললেন, “আমি খুশি, কিন্তু এই পুরস্কার পুরো দলের। স্পেনের প্রতিটি খেলোয়াড় এটার যোগ্য।”
গোল্ডেন গ্লাভ: উনাই সিমনের রেকর্ড
গোল্ডেন গ্লাভ পেয়েছেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
সিমন পুরো বিশ্বকাপে ৭টি ক্লিন শিট রেখেছেন, যা একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। আগের রেকর্ড ছিল ৫টি।
আরো আশ্চর্যের, সিমনের ক্যারিয়ারের মোট বিশ্বকাপ ক্লিন শিট এখন ৯টি, যা রেকর্ডের মাত্র একটি পেছনে। সাবেক ফ্রান্স গোলরক্ষক ফ্যাবিয়েন বার্থেজ ও সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিলটন উভয়েরই ১০টি।
ফাইনালে সিমন ১১টি সেভ করেছেন, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের রেকর্ড।
সেরা তরুণ খেলোয়াড়: পাও কুবারসির বিস্ময়
সেরা তরুণ খেলোয়াড় পেয়েছেন স্পেনের ডিফেন্ডার পাও কুবারসি। মাত্র ১৭ বছর বয়সী এই বার্সেলোনা খেলোয়াড় গোটা টুর্নামেন্টে অসাধারণ খেলেছেন।
কুবারসির কথা মনে রাখুন। এই ছেলে আগামী দশকে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার হওয়ার পথে।
স্পেন আজ কতবার বিশ্বকাপ জিতেছে?
স্পেন জাতীয় ফুটবল দল এখন দুবার বিশ্বকাপ জিতেছে। প্রথমবার ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়, ইনিয়েস্তার গোলে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ হারিয়ে। দ্বিতীয়বার ২০২৬ সালে নিউ জার্সিতে, তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে।
দুটো ফাইনালের মধ্যে আশ্চর্যজনক মিল। দুটোতেই স্কোরলাইন ১-০। দুটোতেই গোল এলো অতিরিক্ত সময়ে। ২০১০ সালে ইনিয়েস্তা ১১৬ মিনিটে গোল করেছিলেন। ২০২৬ সালে তোরেস ১০৬ মিনিটে।
স্পেন এখন সাতটি দলের মধ্যে একটি যারা একাধিকবার বিশ্বকাপ জিতেছে। ব্রাজিল (৫), জার্মানি (৪), ইতালি (৪), আর্জেন্টিনা (৩), ফ্রান্স (২), উরুগুয়ে (২)।
২০১০ থেকে ২০২৬: স্পেনের দুই প্রজন্মের তুলনা
| তুলনা | স্পেন ২০১০ | স্পেন ২০২৬ |
|---|---|---|
| ফাইনাল প্রতিপক্ষ | নেদারল্যান্ডস | আর্জেন্টিনা |
| ফলাফল | ১-০ (AET) | ১-০ (AET) |
| জয়সূচক গোলদাতা | আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (১১৬’) | ফেরান তোরেস (১০৬’) |
| কোচ | ভিসেন্তে দেল বস্কে | লুইস দে লা ফুয়েন্তে |
| সেরা খেলোয়াড় (টুর্নামেন্ট) | ডেভিড ভিয়া | রদ্রি |
| ক্লিন শিট | ৫ | ৭ (রেকর্ড) |
| মূল তারকা | ইনিয়েস্তা, জাভি, পুয়োল | ইয়ামাল, রদ্রি, ওলমো |
এমবাপ্পে বনাম মেসি গোল্ডেন বুট দৌড়: সম্পূর্ণ চিত্র
গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে সেই প্রশ্নের পেছনে ছিল একটা অবিশ্বাস্য লড়াই।
টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ সময় মেসি এগিয়ে ছিলেন। ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু তৃতীয় স্থানের ম্যাচে এমবাপ্পে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২ গোল করে মেসিকে টপকে ১০-এ উঠলেন।
মেসির ফাইনালে হ্যাটট্রিক দরকার ছিল গোল্ডেন বুট জিততে। সেটা হলো না।
| খেলোয়াড় | দেশ | গোল | অ্যাসিস্ট | চূড়ান্ত অবস্থান |
|---|---|---|---|---|
| কিলিয়ান এমবাপ্পে | ফ্রান্স | ১০ | ৪ | গোল্ডেন বুট |
| লিওনেল মেসি | আর্জেন্টিনা | ৮ | ৪ | রানার্সআপ |
| আর্লিং হাল্যান্ড | নরওয়ে | ৭ | — | তৃতীয় |
| জুড বেলিংহাম | ইংল্যান্ড | ৭ | — | চতুর্থ |
| উসমান ডেম্বেলে | ফ্রান্স | ৬ | ৭ | পঞ্চম (অ্যাসিস্ট রেকর্ড) |
| হ্যারি কেইন | ইংল্যান্ড | ৬ | — | ষষ্ঠ |
মাইকেল ওলিসে ও ডেম্বেলের বিশ্বকাপ অ্যাসিস্ট রেকর্ড
ফ্রান্সের মাইকেল ওলিসে এই বিশ্বকাপে ৭টি অ্যাসিস্ট করেছেন, যা একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ, পেলের রেকর্ড ভেঙে। একই সাথে ডেম্বেলেও ৭ অ্যাসিস্ট করেছেন।
এটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। ফ্রান্স চতুর্থ হয়েছে, কিন্তু তাদের দুজন খেলোয়াড় পুরো টুর্নামেন্টের সেরা অ্যাসিস্টদাতা হলেন।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো
এই বিশ্বকাপে অনেক রেকর্ড ভেঙেছে, নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছে:
- এমবাপ্পে ১০ গোল করে বিশ্বকাপের সর্বকালীন শীর্ষ গোলদাতা হলেন
- এমবাপ্পে প্রথম খেলোয়াড় হলেন দুটো বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতার ইতিহাসে
- এমবাপ্পে ১৯৭০-এর গার্ড মুলারের পর প্রথম ১০ গোলের কৃতিত্ব পেলেন
- উনাই সিমন একটি বিশ্বকাপে ৭ ক্লিন শিটের রেকর্ড করলেন
- আর্জেন্টিনা প্রথম দল যারা ফাইনালের নর্মাল টাইমে একটাও শট মারেনি (১৯৬৬ পরবর্তী)
- এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একটি ফাইনালে ১১ সেভের রেকর্ড করলেন
- এনজো ফার্নান্দেজ বিশ্বকাপ ফাইনালে রেড কার্ড পাওয়া ষষ্ঠ খেলোয়াড়, আর্জেন্টিনা ফাইনালে এই কাজ করা তৃতীয় খেলোয়াড় দিল
- ওলিসে ও ডেম্বেলে যৌথভাবে একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৭ অ্যাসিস্টের রেকর্ড করলেন
- ফেরান তোরেস বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় সাবস্টিটিউট হলেন (আগে ২০১৪ সালে মারিও গোটজে)
- তৃতীয় স্থানের ম্যাচে ফ্রান্স বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচে ১০ গোল হলো, যা ১৯৮২-এর পর বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ এবং তৃতীয় স্থানের ম্যাচে সর্বোচ্চ
স্পেন কতবার বিশ্বকাপ জিতেছে: ইতিহাস
স্পেন কতবার বিশ্বকাপ জিতেছে এই প্রশ্নের উত্তর এখন ২ বার।
স্পেনের বিশ্বকাপ শিরোপার যাত্রা:
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা: ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে প্রথম ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ হারার পর সব ম্যাচ জিতেছে। ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ হারিয়েছে ইনিয়েস্তার ১১৬ মিনিটের গোলে।
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র: একই ধরনের যাত্রা। প্রথম ম্যাচ কেপ ভার্দের সাথে ড্র দিয়ে শুরু। তারপর টুর্নামেন্ট জুড়ে আধিপত্য। ফাইনালে তোরেসের ১০৬ মিনিটের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপে?
গোল্ডেন বুট পেয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি পুরো টুর্নামেন্টে ১০ গোল করেছেন এবং ৪টি অ্যাসিস্ট দিয়েছেন। ২০২২ বিশ্বকাপেও তিনি গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন, ফলে তিনি ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় যিনি দুটি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতলেন।
গোল্ডেন বল কে পেল ২০২৬ বিশ্বকাপে?
গোল্ডেন বল পেয়েছেন স্পেনের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার রদ্রি। তিনি পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং ফাইনালে মেসিকে শূন্য শটে আটকে রাখতে মূল ভূমিকা পালন করেছেন। মেসি সিলভার বল এবং এমবাপ্পে ব্রোঞ্জ বল পেয়েছেন।
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনালের ফলাফল কী?
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে জিতেছে অতিরিক্ত সময়ে। ফেরান তোরেস ১০৬ মিনিটে জয়সূচক গোল করেন। এর আগে ৯০+৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে মাঠ ছাড়েন।
এমবাপ্পে কতটি গোল করেছেন ২০২৬ বিশ্বকাপে?
এমবাপ্পে ২০২৬ বিশ্বকাপে মোট ১০টি গোল করেছেন। এর মধ্যে তৃতীয় স্থানের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২ গোল করে মেসিকে (৮ গোল) টপকে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেন এবং বিশ্বকাপের সর্বকালীন সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
ফেরান তোরেসের গোল কীভাবে হলো?
ফেরান তোরেস ৬২ মিনিটে সাবস্টিটিউট হিসেবে মাঠে নামেন। ১০৬ মিনিটে, অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম মিনিটে, তিনি বক্সে ঢুকে শক্তিশালী শটে গোল করেন। তখন আর্জেন্টিনা এনজোর লাল কার্ডে ১০ জনে খেলছিল।
আর্জেন্টিনা কেন ফাইনালে কোনো শট মারতে পারেনি?
নর্মাল টাইমে আর্জেন্টিনা একটাও শট মারতে পারেনি কারণ স্পেনের রক্ষণ ও মাঝমাঠ মেসির কাছে বল পৌঁছানোর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। মেসি পুরো ম্যাচে মাত্র ৫৪ বার বল স্পর্শ করেছেন। এটা বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথমবার কোনো দল ৯০ মিনিটে শূন্য শটে শেষ করল।
স্পেন কতবার বিশ্বকাপ জিতেছে?
স্পেন দুবার বিশ্বকাপ জিতেছে। প্রথমবার ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেদারল্যান্ডসকে ১-০ হারিয়ে। দ্বিতীয়বার ২০২৬ সালে নিউ জার্সিতে আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে। দুটো ফাইনালেই স্কোরলাইন ১-০, দুটোতেই গোল এলো অতিরিক্ত সময়ে।
উনাই সিমন কেন গোল্ডেন গ্লাভ পেলেন?
উনাই সিমন এই বিশ্বকাপে ৭টি ক্লিন শিট রেখেছেন, যা একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রেকর্ড। ফাইনালে ১১টি সেভ করেছেন, যা ফাইনালেরও রেকর্ড। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণেই স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল খেয়েছে।
উপসংহার: স্পেনের নতুন সুবর্ণ যুগ, এমবাপ্পের ইতিহাস
বিশ্বকাপ ২০২৬ শেষ হলো একটা নতুন ইতিহাস লিখে।
স্পেন দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ইয়ামাল, রদ্রি, কুবারসি, তোরেস এই প্রজন্ম এখন স্পেনের ফুটবলের নতুন পরিচয়। ২০১০-এ ইনিয়েস্তা-জাভির দলের মতো, এই দলটাও ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট কে পেয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর নিজেই হয়ে উঠলেন। ১০ গোল, ২ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপের সর্বকালীন শীর্ষ গোলদাতা। ফ্রান্স চতুর্থ হলেও এমবাপ্পে নিজের যুগ তৈরি করছেন।
আর মেসি। ৩৯ বছর বয়সে এই বিশ্বকাপে তাঁর অবদান কেউ ভুলবে না। কিন্তু শেষটা হলো না তাঁর পছন্দমতো। মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মেসির ছবি এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগময় দৃশ্য।
ফুটবল অপেক্ষা করে না। পরের বিশ্বকাপ ২০৩০ সালে। সেখানে ইয়ামাল ২১ বছরের। এমবাপ্পে ৩১। এই গল্প চলবে।
Jeta33-এ যোগ দিন এবং আগামী মৌসুমের ফুটবলের উত্তেজনাও উপভোগ করুন। Jeta33-এর সব প্রমোশন দেখুন এবং ভিআইপি রিওয়ার্ড প্রোগ্রামে যোগ দিন।
k