
ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন ২০১৮ সালে, শেষ পেশাদার ম্যাচ খেলেছিলেন তারও তিন বছর আগে। কিন্তু সব হিসাব উল্টে দিয়ে আবার শিরোনামে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদিনহো। ৪৬ বছর বয়সে ইতালির তৃতীয় বিভাগের ক্লাব রাভেন্নায় নাম লিখিয়ে তিনি নতুন করে মাঠে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
খবরটা শুনে অনেক ভক্তেরই চোখ কপালে উঠেছে। এই বয়সে এসে একজন বিশ্বকাপজয়ী তারকা আবার পেশাদার ক্লাবে যোগ দেবেন, ব্যাপারটা সহজে বিশ্বাস করার মতো নয়। তবে রোনালদিনহো বরাবরই চমক দিতে ভালোবাসেন, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
যিনি একসময় মাঠে নেমে প্রতিপক্ষকে হাসতে হাসতে বোকা বানাতেন, তিনি আবার বুট পরার কথা ভাবছেন, এটাই এখন ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত খবর। চলুন, পুরো ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে দেখা যাক।
সমুদ্রসৈকতে জমকালো ‘রোনালদিনহো ডে’
গত ২০ আগস্ট রাভেন্না শহরের একটি সমুদ্রসৈকতে আয়োজন করা হয় তার আনুষ্ঠানিক পরিচিতি অনুষ্ঠান। আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘রোনালদিনহো ডে’। নামটাই বলে দেয়, ক্লাবের কাছে তিনি কতটা বড় প্রাপ্তি।
সেদিন আবহাওয়া ছিল বৃষ্টিভেজা, তবু ভক্তদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। প্রায় ছয় হাজার সমর্থক জড়ো হন তাকে এক নজর দেখতে। অনুষ্ঠানে ক্লাবের ১০ নম্বর জার্সি হাতে নিয়ে সমর্থকদের অভিবাদন জানান ব্রাজিলিয়ান এই কিংবদন্তি।
এত বছর পরও তাকে ঘিরে ভক্তদের এই উন্মাদনা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। এটাই প্রমাণ করে, ফুটবল ইতিহাসে রোনালদিনহোর জায়গাটা সময়ের সঙ্গে এতটুকুও ফিকে হয়নি।
এক দশক পর পেশাদার ফুটবলে ফেরা
রোনালদিনহোর শেষ পেশাদার ম্যাচ ছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে, ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ফ্লুমিনেন্সের হয়ে। এরপর ২০১৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেন। মাঝের সময়টায় নানা প্রদর্শনী ম্যাচ আর ফুটসালে দেখা গেলেও, পেশাদার ফুটবলে তার ফেরার কথা কেউ ভাবেনি।
সেই হিসাবে ধরলে, দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর তিনি আবার কোনো পেশাদার ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হলেন। এই দীর্ঘ বিরতিই খবরটাকে আরও চমকপ্রদ করে তুলেছে। সাধারণত এই বয়সে খেলোয়াড়রা কোচিং বা ধারাভাষ্যে থিতু হন, সেখানে রোনালদিনহো আবার মাঠের কথা ভাবছেন।
মাঠে নামবেন কি না, এখনও ধোঁয়াশা
ক্লাবে যোগ দিলেও রোনালদিনহো আসলে মাঠে নামবেন কি না, সেটা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এ নিয়ে তার নিজের বক্তব্যও বেশ খোলামেলা। তিনি বলেছেন, তিনি খেলবেন কি না সেটা কোচই ভালো জানেন, তবে ইতালিতে ফিরে তার ভালো লাগছে এবং তিনি দলের সাফল্যে অবদান রাখতে চান।
রাভেন্নায় এসে তিনি জানিয়েছেন, এখানে আসতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত, আর দলকে নিয়ে ভালো কিছু করার সুযোগ দেখছেন। কথাগুলো শুনলে বোঝা যায়, ব্যাপারটা নিয়ে তিনি নিজেও বেশ রোমাঞ্চিত।
তবে ইতালির সংবাদমাধ্যম বলছে, খুব দ্রুত তাকে মাঠে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই ভক্তদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
চোখ এখন ৩০০ গোলের মাইলফলকে
এই ফেরার পেছনে একটা ব্যক্তিগত লক্ষ্যও কাজ করছে বলে মনে হয়। ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ৭৮৭ ম্যাচে রোনালদিনহোর গোল ২৯৯টি। অর্থাৎ ৩০০ গোলের মাইলফলক ছুঁতে তার দরকার মাত্র একটি গোল।
এই একটা গোলই যেন তার সামনে ঝুলে থাকা এক অসমাপ্ত অধ্যায়। এত বড় ক্যারিয়ারে গোলসংখ্যাটা ২৯৯-এ থেমে থাকা, ব্যাপারটা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই খানিকটা অতৃপ্তির।
তিনি নিজেও সেটা আড়াল করেননি। রোনালদিনহো বলেছেন, নিজেকে বেশ ফিট মনে হচ্ছে, আর যদি ৩০০তম গোলটা করতে পারেন, তাহলে সেটা তার জন্য বিশেষ কিছু হবে। রাভেন্নার জার্সিতে সেই গোলটা এলে, তা নিঃসন্দেহে হয়ে থাকবে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
রোনালদিনহোর সোনালি ক্যারিয়ার
আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছে রোনালদিনহো হয়তো শুধু ইউটিউবের হাইলাইট। কিন্তু তার ক্যারিয়ারটা ছিল ট্রফি আর জাদুতে ভরা। ব্রাজিলের এই তারকা ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বেশি আলো ছড়িয়েছেন বার্সেলোনার জার্সিতে, আর সেখানেই কাটে তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়।
তার প্রধান অর্জনগুলো এক নজরে দেখে নিন:
- ২০০২ বিশ্বকাপ: ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক গোল।
- ব্যালন ডি অর: ২০০৫ সালে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি।
- ফিফা বর্ষসেরা: ২০০৪ ও ২০০৫, টানা দুবার।
- চ্যাম্পিয়ন্স লিগ: ২০০৬ সালে বার্সেলোনার হয়ে ইউরোপ সেরা।
- লা লিগা: বার্সেলোনার হয়ে দুটি স্প্যানিশ লিগ শিরোপা।
ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ৯৭ ম্যাচে তার গোল ৩৩টি। বার্সেলোনার জার্সিতে করেছেন ৯৪ গোল, আর এসি মিলানের হয়ে ২৪টি। ক্যারিয়ারে পিএসজি, গ্রেমিও আর আতলেতিকো মিনেইরোর মতো ক্লাবেও তিনি খেলেছেন।
যে জাদু আজও ভোলেনি ফুটবল
রোনালদিনহোকে আলাদা করে তোলে তার খেলার ধরন। জেতাটাই তার কাছে সব ছিল না, খেলাটাকে উপভোগ করা আর দর্শকদের আনন্দ দেওয়াও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে তার মুখে সবসময় লেগে থাকত সেই বিখ্যাত হাসি।
ড্রিবলিং, ফ্রি-কিক আর অবিশ্বাস্য সব ট্রিক দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতেন। ২০০৫ সালে রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে তার পারফরম্যান্স দেখে খোদ মাদ্রিদ সমর্থকরাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছিলেন, যা ফুটবলে বিরল এক দৃশ্য।
তিনি সেই বিরল খেলোয়াড়দের একজন, যিনি একটা গোটা প্রজন্মকে আনন্দের সঙ্গে ফুটবল খেলতে অনুপ্রাণিত করেছেন। লিওনেল মেসিসহ অনেক তারকাই বার্সেলোনায় তার সতীর্থ ছিলেন, আর তার কাছ থেকে শিখেছেন অনেক কিছু।
এমন কিংবদন্তিদের গল্প আর বিশ্ব ফুটবলের নিয়মিত খবর পেতে চোখ রাখুন জেটা৩৩ ব্লগে।
রাভেন্নার পরিকল্পনা কী
রোনালদিনহোকে দলে টানার ভাবনাটা প্রথম সামনে আনেন রাভেন্নার মালিক ইগনাসিও সিপ্রিয়ানি। গত জুনে, ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে মায়ামিতে তিনি এই উদ্যোগের কথা জানান। শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, ভবিষ্যতে ক্লাবের অংশীদারও হতে পারেন রোনালদিনহো।
সিপ্রিয়ানির ভাষায়, এই উদ্যোগের পেছনে আছে আবেগের একটা গল্প। তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, রোনালদিনহোকে দিয়েই তার ক্যারিয়ারের ৩০০তম গোলটা করানো। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এটা নিছক প্রচারণার কোনো কৌশল নয়।
ক্লাবটির নিজেরও একটা লক্ষ্য আছে। গত মৌসুমে ইতালির তৃতীয় বিভাগের ‘বি’ গ্রুপে তৃতীয় হয়েছিল রাভেন্না। ২০০৮ সালের পর আবার সিরি ‘বি’তে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে তারা নতুন মৌসুম শুরু করছে। রোনালদিনহোর মতো একটা নাম দলের সঙ্গে থাকলে সমর্থক আর মনোযোগ, দুটোই বাড়বে।
তবে সোমবার রেজিয়ানার বিপক্ষে মৌসুমের প্রথম ম্যাচে তাকে মাঠে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই জানিয়েছে ইতালির সংবাদমাধ্যম। ফলে তার পেশাদার ফুটবলে প্রত্যাবর্তন ঠিক কবে হচ্ছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এই ফেরা কেন এত আলোচিত
সত্যি বলতে, ৪৬ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে ফেরা খুবই অস্বাভাবিক একটা ঘটনা। বেশিরভাগ খেলোয়াড় এই বয়সে অনেক আগেই বুট তুলে রাখেন। তাই রোনালদিনহোর এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি করেছে।
তবে এর পেছনে যতটা না পেশাদারিত্ব, তার চেয়ে বেশি আবেগ। একটা কিংবদন্তিকে আবার মাঠে দেখার সুযোগ, সঙ্গে সেই ৩০০তম গোলের রোমাঞ্চ, এই দুই মিলেই খবরটাকে বিশেষ করে তুলেছে। বাংলাদেশের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর কাছেও রোনালদিনহো নামটা এক নস্টালজিয়া।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
রোনালদিনহো কোন ক্লাবে যোগ দিয়েছেন?
রোনালদিনহো ইতালির তৃতীয় বিভাগের ক্লাব রাভেন্নায় যোগ দিয়েছেন। ৪৬ বছর বয়সে অবসর ভেঙে তিনি নতুন করে পেশাদার ফুটবলে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২০ আগস্ট রাভেন্না শহরের একটি সমুদ্রসৈকতে তার আনুষ্ঠানিক পরিচিতি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
রোনালদিনহো কবে অবসর নিয়েছিলেন?
রোনালদিনহো ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল থেকে অবসর নেন। তবে তার শেষ পেশাদার ম্যাচ ছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে, ফ্লুমিনেন্সের হয়ে। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রদর্শনী ম্যাচ ও ফুটসালে খেললেও পেশাদার ফুটবলে ফেরেননি, প্রায় এক দশক পর এবার সেই সম্ভাবনা তৈরি হলো।
রোনালদিনহোর ক্যারিয়ারে মোট কত গোল?
রোনালদিনহো ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ৭৮৭ ম্যাচে ২৯৯ গোল করেছেন। ৩০০ গোলের মাইলফলক ছুঁতে তার দরকার মাত্র একটি গোল। এর মধ্যে বার্সেলোনার হয়ে ৯৪, এসি মিলানের হয়ে ২৪ এবং ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ৩৩ গোল রয়েছে।
রোনালদিনহো কি সত্যিই আবার মাঠে নামবেন?
এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। রোনালদিনহো নিজেই বলেছেন, তিনি খেলবেন কি না সেটা কোচের সিদ্ধান্ত। তিনি ক্লাবে যোগ দিয়েছেন এবং দলের সাফল্যে অবদান রাখতে চান, তবে মৌসুমের প্রথম ম্যাচে তাকে মাঠে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছে ইতালির সংবাদমাধ্যম।
রোনালদিনহো কোন ক্লাবে সবচেয়ে সফল ছিলেন?
রোনালদিনহো ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে সফল ছিলেন বার্সেলোনায়। এই স্প্যানিশ ক্লাবের হয়ে তিনি ৯৪ গোল করেন, দুটি লা লিগা ও ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতেন এবং ২০০৫ সালে ব্যালন ডি অর পান। বার্সেলোনার সেই সময়টাকেই তার ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায় ধরা হয়।
রোনালদিনহো কি বিশ্বকাপ জিতেছেন?
হ্যাঁ, রোনালদিনহো ২০০২ সালে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন। ওই আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার দূরপাল্লার ফ্রি-কিক গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত মুহূর্ত। এই গোলটিকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সেরা গোল হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
শেষ কথা
রোনালদিনহোর এই ফেরা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক টুকরো নস্টালজিয়া। ৪৬ বছর বয়সে এসে আরেকবার বুট পরার এই সিদ্ধান্ত হয়তো পুরোপুরি পেশাদার নয়, তবে এতে আবেগের কমতি নেই। আর সামনে ঝুলে থাকা সেই ৩০০তম গোলের গল্পটাও দারুণ রোমাঞ্চকর।
তিনি শেষ পর্যন্ত মাঠে নামবেন কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, যেদিনই তিনি রাভেন্নার জার্সিতে মাঠে পা রাখবেন, সেদিন গ্যালারিতে ফিরে আসবে সেই পুরনো জাদুর অপেক্ষা। একজন কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়টা কেমন হয়, তা দেখতে চোখ রাখুন মাঠের দিকে।
ফুটবলের এমন সব বড় খবর আর ম্যাচের বিশ্লেষণ নিয়মিত পেতে সঙ্গে থাকুন জেটা৩৩ ব্লগের।
