
রুডি ফোলার বলেছেন আর্জেন্টিনার খেলার সাথে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক নেই। জার্মান ফুটবল কোচ অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ডিএফবির স্পোর্টিং ডিরেক্টর ও জার্মানির সাবেক বিশ্বকাপজয়ী স্ট্রাইকার। স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনালে আর্জেন্টিনার রানার্সআপ হওয়ার পরও তারা যে প্রশংসা পাচ্ছে সেটা তার বোধগম্য নয় বলে জানিয়েছেন ফোলার।
রুডি ফোলার কে? এক কিংবদন্তির সংক্ষিপ্ত পরিচয়
রুডি ফোলারের পুরো নাম রুডলফ ফোলার। জন্ম ১৩ এপ্রিল ১৯৬০ সালে। জার্মান ফুটবলে তিনি একটা আলাদা জায়গা নিয়ে আছেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ছিলেন একজন ক্ষুরধার স্ট্রাইকার। কোচ হিসেবে জার্মানিকে ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে গেছেন। আর এখন ডিএফবির স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে জার্মান ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করছেন।
তার ডাকনাম ‘টান্টে কেটে’ অর্থাৎ ‘আন্টি কেটি’। এই নামটা এসেছে তার বিখ্যাত কোঁকড়া চুলের কারণে। জার্মানিতে এই মানুষটাকে সবাই ভালোবাসেন। তবে তার মতামত সবসময় স্পষ্ট এবং অকপট।
ফোলার জাতীয় দলের হয়ে ৯০টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ৪৭ গোল করেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি ওয়ের্দার ব্রেমেন, ১৮৬০ মিউনিখ, এএস রোমা, মার্সেই ও বায়ার লেভারকুসেনে খেলেছেন।
১৯৯৩ সালে মার্সেইয়ের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন। বুন্দেসলিগায় বায়ার লেভারকুসেনসহ তিনটি ক্লাবে মোট ২৩২ ম্যাচে ১৩২ গোল করেছেন।
রুডি ফোলার ও আর্জেন্টিনা: ৪০ বছরের পুরনো দ্বৈরথ
রুডি ফোলার এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে সম্পর্কটা শুধু সমালোচনার না, এর পেছনে রয়েছে বিশ্বকাপের দুটো অবিস্মরণীয় ফাইনালের গল্প।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল: হারের স্মৃতি
১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানি ৩-২ গোলে হেরেছিল। সেই ম্যাচে ফোলার ৮০ মিনিটে গোল করে স্কোর ২-২ করেছিলেন। তার সেই গোলে মনে হয়েছিল জার্মানি হয়তো উদ্ধার পাবে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
ফোলার ছিলেন তৃতীয় খেলোয়াড় যিনি সাবস্টিটিউট হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করলেন। ম্যারাডোনার সেই আর্জেন্টিনা দল তখন অপরাজেয়। ম্যারাডোনার হাত ও পা মিলিয়ে ইংল্যান্ডকে হারানো, তারপর পশ্চিম জার্মানিকে হারানো। সেই ফাইনালের হার আজও ফোলারের বুকে কোথাও একটু কষ্ট দেয়।
১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনাল: প্রতিশোধ ও শিরোপা
চার বছর পর ১৯৯০ সালে রোমে ফের ফাইনাল। ফের আর্জেন্টিনা বনাম পশ্চিম জার্মানি।
এবার জার্মানি ১-০ গোলে জিতল। সেই জয়ই ছিল ফোলারের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ মুহূর্ত। রোমে তখন ফোলার এএস রোমার হয়ে খেলছিলেন। স্থানীয় দর্শকরা তাকে ভালোবাসতেন। সেই মাঠেই জার্মানির জার্সিতে বিশ্বকাপ জেতা ছিল এক অনন্য অনুভূতি।
এই কৃতিত্বের কারণে ফোলার মারিও জাগালো ও ফ্রান্ৎস বেকেনবাউয়ারের সাথে সেই বিরল তালিকায় আছেন যারা বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলোয়াড় ও কোচ উভয় ভূমিকায় পৌঁছেছেন।
বিশ্বকাপে ফোলারের সম্পূর্ণ রেকর্ড
| বছর | ভূমিকা | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১৯৮৬ | খেলোয়াড় | রানার্সআপ (ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হার) |
| ১৯৯০ | খেলোয়াড় | বিশ্বচ্যাম্পিয়ন (ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে) |
| ১৯৯৪ | খেলোয়াড় | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ২০০২ | কোচ | রানার্সআপ (ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার) |
রুডি ফোলারের বিস্ফোরক মন্তব্য: ঠিক কী বলেছেন তিনি?
জার্মান ফুটবল কোচ অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফবি) আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেওয়া বক্তব্যে ফোলার প্রথমে জার্মানির রক্ষণ নিয়ে কথা বলছিলেন।
টিওয়াইসি স্পোর্টসের বরাতে ফোলার বলেন, ‘আমি বলেছিলাম জার্মানিকে রক্ষণে আরও উন্নতি করতে হবে। অনেকেই আর্জেন্টিনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে সেটা ভুল উদাহরণ। হঠাৎ করেই আর্জেন্টাইনরা সবার মানদণ্ড হয়ে উঠল! এই আলোচনাটাকে আমার কিছুটা ভণ্ডামি বলে মনে হয়েছে।’
এরপর তিনি আরো সরাসরি কথা বললেন।
তার ভাষায়, ‘আমি আর্জেন্টিনার মতো খেলতে চাই না। ওদের খেলার সঙ্গে ফুটবলের কোনো সম্পর্কই নেই। হ্যাঁ, তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ছিল, এবার রানার্সআপ হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে, তাদের নিয়ে এত প্রশংসা আমি বুঝতে পারি না।’
স্পেন ও ইংল্যান্ড প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘প্রশংসা আসলে স্পেনের প্রাপ্য, আর ইংলিশরাও খুব দারুণ রক্ষণ সামলেছে।’
জার্মানির নিজস্ব দুর্বলতা স্বীকার করতেও পিছপা হননি। ফোলার বলেন, ‘আমি কিন্তু বলিনি যে আমরা রক্ষণ করতে জানি না। আমরা পারি, তবে আমাদের আরও ভালোভাবে রক্ষণ করতে হবে। আর সেই কাজটা শুরু করতে হবে আক্রমণভাগ কিংবা মাঝমাঠ থেকেই।’
ফোলার কেন আর্জেন্টিনার সমালোচনা করলেন? আসল কারণ কী?
এই প্রশ্নটার উত্তর বোঝার জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলার ধরনটা একটু বিশ্লেষণ করতে হবে।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অনেকটাই একজনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। সেটা হলেন মেসি। মেসি গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেছেন, এককভাবে ম্যাচ পাল্টে দিয়েছেন। কিন্তু মেসিকে বাদ দিলে আর্জেন্টিনার দলীয় ফুটবলটা ছিল বেশিরভাগ সময় রক্ষণমুখী ও পাল্টা আক্রমণনির্ভর।
বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা নর্মাল টাইমে একটাও শট মারতে পারেনি। স্পেনের বিরুদ্ধে বল দখলে ছিল মাত্র ৪৩%। মেসি পুরো ম্যাচে ৫৪ বার বল স্পর্শ করেছেন। এটা একটা বড় দলের ফাইনালের পরিসংখ্যান না।
ফোলারের দৃষ্টিতে, যে দল এভাবে খেলে, মাঝমাঠে আধিপত্য নেই, বল দখল নেই, সেই দল কীভাবে জার্মান ফুটবলের রোল মডেল হয়? এটাই তার আপত্তির মূল জায়গা।
আর্জেন্টিনার খেলার ধরন: ফোলারের সমালোচনা কি সঠিক?
এটা একটা বিতর্কিত প্রশ্ন। ফোলারের সমালোচনার সাথে অনেকে একমত, আবার অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন।
যারা ফোলারের সাথে একমত, তাদের যুক্তি হলো: ফুটবলে প্রক্রিয়ার সৌন্দর্য থাকা দরকার। শুধু ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন হয় না। স্পেনের মতো দলীয় সমন্বয়, বল দখল ও আক্রমণাত্মক ফুটবল হওয়া উচিত আদর্শ।
যারা ফোলারের সাথে দ্বিমত, তারা বলেন: ফুটবলে জেতাটাই সব। আর্জেন্টিনা ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছে, ২০২৬-এ ফাইনালে উঠেছে। তাদের কৌশল কাজ করছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষমতাই দক্ষতার পরিচয়।
তবে একটা ব্যাপারে দুই পক্ষই একমত। মেসির উপস্থিতি আর্জেন্টিনার খেলার মানকে অনেক উপরে নিয়ে যায়। মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা কতটা শক্তিশালী, সেটা এখনো পরীক্ষিত।
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পরও ফোলার বলেছিলেন, ‘লিওনেল মেসি—যিনি অসাধারণ এবং যাকে সবাই বিশ্বজয়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, তিনি ছাড়া আর্জেন্টাইনরা যে আমাদের চেয়ে ভালো দল, তা কেউ আমাকে বোঝাতে পারবে না।’
এই কথাটা ফোলার দুই বছর ধরে বলে আসছেন। এবার আরো জোরালোভাবে বললেন।
জার্মানি ২০২৬ বিশ্বকাপ: কেন তৃতীয়বার ব্যর্থ হলো?
ফোলারের মন্তব্যের একটা প্রেক্ষাপট আছে। এবার বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে জার্মানি।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির এই পরিণতি জার্মান ফুটবলের জন্য বড় ধাক্কা। ২০১৮-তে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০২২-এ নকআউট পর্বে বিদায়, এবার শেষ ষোলোতে বিদায়।
ফোলার এই পরিপ্রেক্ষিতেই বলছেন, জার্মান ফুটবলকে তার নিজস্ব পথ খুঁজতে হবে। আর্জেন্টিনার অনুকরণ করলে সেই পথ পাওয়া যাবে না।
জার্মান ফুটবলের ঐতিহ্য হলো সংগঠিত দলীয় খেলা, শক্তিশালী মাঝমাঠ ও সুশৃঙ্খল রক্ষণ। ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪-এর বিশ্বকাপ জয় এই ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করেই হয়েছে।
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনাল ২০২৬: কেন স্পেনকে প্রশংসা করলেন ফোলার?
ফোলারের মন্তব্য শুধু আর্জেন্টিনার সমালোচনা ছিল না। তিনি সমান্তরালে স্পেনের দারুণ প্রশংসা করেছেন। তার মতে, স্পেন আধুনিক ফুটবলে ভারসাম্যপূর্ণ খেলায় অনুসরণযোগ্য দল।
কেন স্পেন? কারণ স্পেন এই বিশ্বকাপে সব কিছু মিলিয়ে সেরা দল ছিল।
পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র ১টি গোল খেয়েছে। ৭টি ক্লিন শিট রেখেছে, যা একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রেকর্ড। ফাইনালে আর্জেন্টিনা নর্মাল টাইমে একটাও শট মারতে পারেনি।
রদ্রি মাঝমাঠে যে নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন, ইয়ামাল উইংয়ে যে জাদু দেখিয়েছেন, উনাই সিমন গোলে যে দুর্ভেদ্যতা দেখিয়েছেন, এগুলো দলীয় ফুটবলের চমৎকার উদাহরণ।
ফোলার ফুটবলের এই সংগঠিত, বল দখলভিত্তিক ও আক্রমণাত্মক দর্শনকে ভালোবাসেন। স্পেন সেটাই করেছে।
ফাইনালের মূল তথ্য: স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ম্যাচ | স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনাল |
| তারিখ | ১৯ জুলাই ২০২৬ |
| ভেন্যু | মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি |
| ফলাফল | স্পেন ১-০ আর্জেন্টিনা (অতিরিক্ত সময়ে) |
| গোলদাতা | ফেরান তোরেস (১০৬’) |
| লাল কার্ড | এনজো ফার্নান্দেজ (৯০+৩’, দ্বিতীয় হলুদ) |
| আর্জেন্টিনার শট (নর্মাল টাইম) | ০ |
| উনাই সিমনের সেভ | ১১ (ফাইনালের রেকর্ড) |
| স্পেনের শট | ২০ |
| বলের দখল | স্পেন ৫৭%, আর্জেন্টিনা ৪৩% |
ফাইনালের আগে ও পরে আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা
ফোলার একমাত্র মানুষ নন যিনি আর্জেন্টিনার খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফাইনালের আগে থেকেই ইউরোপের ফুটবল বিশেষজ্ঞরা এই প্রশ্ন করে আসছিলেন।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ খেলার একটা প্যাটার্ন আছে। তারা গ্রুপ পর্বে ভালো খেলে। নকআউটে পড়লে চাপে পড়ে। এমনকি হারের মুখে থেকেও ঘুরে আসে। এই প্রত্যাবর্তনের ক্ষমতা তাদের শক্তি।
কিন্তু এই সীমানার মধ্যে খেলার সীমাবদ্ধতাও আছে। ফাইনালে একটা শট না মারাটা সেই সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
তবে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা বলেন, চাপের মুখে টিকে থাকা এবং বড় মঞ্চে পারফর্ম করার ক্ষমতাও ফুটবলেরই অংশ। ফলাফলই শেষ কথা।
ফোলারের মন্তব্যে সামাজিক মাধ্যমে ঝড়
ফোলারের এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার সমর্থকরা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, যে দল দুটো বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছে, তাদের খেলা ‘ফুটবল না’ এই কথা হাস্যকর। জার্মানি যখন শেষ ষোলোতে বিদায় নিচ্ছে, তখন তাদের স্পোর্টিং ডিরেক্টরের মুখে আর্জেন্টিনার সমালোচনা মানায় না।
তবে জার্মানি ও স্পেনের সমর্থকরা ফোলারের সাথে একমত। তাদের মতে, ফোলার সঠিক কথাই বলেছেন। দলীয় ফুটবলের মানদণ্ড স্পেন, আর্জেন্টিনা নয়।
বাংলাদেশেও এই আলোচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। ফোলারের মন্তব্যে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত।
রুডি ফোলারের ক্যারিয়ারের মূল মাইলফলক
রুডি ফোলার শুধু একজন সমালোচক না। তার নিজের ক্যারিয়ারে অনেক বড় অর্জন আছে।
| সময়কাল | অর্জন |
|---|---|
| ১৯৮২ | জার্মান জাতীয় দলে প্রথম ক্যাপ |
| ১৯৮২-৮৩ | ওয়ের্দার ব্রেমেনে বুন্দেসলিগার শীর্ষ গোলদাতা |
| ১৯৮৩ | জার্মান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার |
| ১৯৮৬ | বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল (জার্মানি হেরেছিল ৩-২) |
| ১৯৯০ | বিশ্বকাপ শিরোপা (ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে) |
| ১৯৯১ | এএস রোমার হয়ে কোপ্পা ইতালিয়া জয় |
| ১৯৯৩ | মার্সেইয়ের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় |
| ২০০২ | কোচ হিসেবে জার্মানিকে বিশ্বকাপ ফাইনালে নেওয়া |
| ২০২৩ | ডিএফবি স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া |
ফোলার ও জার্মান ফুটবলের ভবিষ্যৎ
ফোলার ২০২৩ সাল থেকে ডিএফবির স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বে আছেন এবং ২০২৮ ইউরো পর্যন্ত এই পদে থাকার পরিকল্পনা রয়েছে।
জার্মান ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব তার কাঁধে। এই বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নেওয়া তার জন্য বড় ব্যর্থতা।
তিনি মনে করেন, জার্মান ফুটবলকে তার নিজস্ব পরিচয় ফিরে পেতে হবে। সেই পরিচয় হলো সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও বলদখলভিত্তিক ফুটবল। আর সেই পথে স্পেনই তার কাছে আদর্শ, আর্জেন্টিনা নয়।
সাবেক তারকারা কী বলছেন?
ফোলারের মন্তব্যে ফুটবল বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
কিছু ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ তার সাথে একমত। তাদের মতে, আর্জেন্টিনার এই মেসিকেন্দ্রিক ফুটবল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। মেসির পরে আর্জেন্টিনা কোথায় দাঁড়াবে সেই প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঠতে শুরু করেছে।
আবার ল্যাটিন আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোলারের মন্তব্যে জার্মান দম্ভের ছায়া আছে। জার্মানি নিজেই যখন তলানিতে, তখন অন্যের সমালোচনা করা মানায় না।
আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি এখন পর্যন্ত এই মন্তব্যে সরাসরি কিছু বলেননি। তার দল ফাইনালে হেরেছে। এই হারের যন্ত্রণা এখনো তাজা। কংগ্রেসে কাউকে জবাব দেওয়ার চেয়ে দলটাকে কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা যায়, সেটা নিয়েই ব্যস্ত তিনি।
ফোলারের মন্তব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই মন্তব্যটা বোঝার জন্য একটু পেছনে তাকানো দরকার।
জার্মানি ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দশকের পুরনো। তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৮৬-তে আর্জেন্টিনা জিতেছে। ১৯৯০-এ জার্মানি জিতেছে। ২০১৪-এ জার্মানি জিতেছে।
ফোলার ব্যক্তিগতভাবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ ছিলেন। ১৯৮৬-এর হার ও ১৯৯০-এর জয়, দুটোই তার অভিজ্ঞতার অংশ।
এই ইতিহাসের আলোকে দেখলে ফোলারের মন্তব্যকে শুধু কারিগরি সমালোচনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর মধ্যে একটা ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতার আবেগও আছে।
আর্জেন্টিনার খেলা কি সত্যিই ‘ফুটবল না’?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে ১৯টি গোল করেছে, সর্বোচ্চ। মেসি ৮ গোল করেছেন। এনজো ফার্নান্দেজ একাদশে গোল করেছেন। লাউতারো মার্তিনেজ শেষ মুহূর্তে ম্যাচ পাল্টে দিয়েছেন।
এই দলটা খারাপ ফুটবল খেলেছে, এটা বলা কঠিন। কিন্তু স্পেনের মতো সুসংগঠিত, বলদখলভিত্তিক ফুটবল তারা খেলেনি, এটাও সত্য।
ফোলার যা বলতে চেয়েছেন সেটা হলো, আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শন জার্মানির জন্য উপযুক্ত মডেল না। এটা তার দেশের ফুটবলের জন্য একটা পেশাদার মূল্যায়ন।
তবে ‘ফুটবলের সাথে সম্পর্ক নেই’ এই কথাটা অনেকের কাছেই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। কারণ আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছে, তাদের খেলোয়াড়রা বিশ্বের সেরাদের মধ্যে পড়েন, তারা গোল করেছেন, ম্যাচ জিতেছেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
রুডি ফোলার আর্জেন্টিনা সম্পর্কে কী বলেছেন?
রুডি ফোলার জার্মান ফুটবল কোচ অ্যাসোসিয়েশনের কংগ্রেসে বলেছেন, আর্জেন্টিনার খেলার সাথে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও বলেছেন, আর্জেন্টিনাকে জার্মান ফুটবলের রোল মডেল করাটা ভণ্ডামি। স্পেনকে তিনি আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রুডি ফোলার কে?
রুডি ফোলার জার্মানির সাবেক বিশ্বকাপজয়ী স্ট্রাইকার। ১৩ এপ্রিল ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে খেলেছেন এবং ৯০ ক্যাপে ৪৭ গোল করেছেন। বর্তমানে তিনি ডিএফবির স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
ফোলার কি আগেও আর্জেন্টিনার সমালোচনা করেছেন?
হ্যাঁ। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জেতার পরও ফোলার বলেছিলেন, মেসি বাদ দিলে আর্জেন্টিনা জার্মানির চেয়ে ভালো দল নয়। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের পরেও তিনি একই সুরে কথা বলেছেন।
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনালে কী হয়েছিল?
স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে জিতেছে অতিরিক্ত সময়ে। ফেরান তোরেস ১০৬ মিনিটে একমাত্র গোল করেন। আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ ৯০+৩ মিনিটে দ্বিতীয় হলুদে লাল কার্ড পান। নর্মাল টাইমে আর্জেন্টিনা একটাও শট মারতে পারেনি।
ফোলার বিশ্বকাপে কোন ফাইনালে খেলেছেন?
ফোলার ১৯৮৬ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছেন। ১৯৮৬-এ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জার্মানি ৩-২ হেরেছিল, ফোলার গোল করেছিলেন। ১৯৯০-এ আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে জার্মানি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, ফোলার সেই দলের সদস্য ছিলেন।
ফোলার কোন ক্লাবে খেলেছেন?
ফোলার ওয়ের্দার ব্রেমেন, ১৮৬০ মিউনিখ, এএস রোমা, মার্সেই ও বায়ার লেভারকুসেনে খেলেছেন। রোমায় তাকে ‘ইল টেডেস্কো ভোলান্তে’ বা ‘উড়ন্ত জার্মান’ বলা হতো। ১৯৯৩ সালে মার্সেইয়ের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন।
জার্মানি ২০২৬ বিশ্বকাপে কোথায় বিদায় নিয়েছে?
জার্মানি রাউন্ড অব সিক্সটিনে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের এই বিদায় জার্মান ফুটবলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উপসংহার: একটা মন্তব্য যা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিল
রুডি ফোলারের এই মন্তব্য ফুটবলের একটা মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ফুটবলে কি শুধু ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ, নাকি খেলার ধরনও মূল্যায়িত হওয়া উচিত?
স্পেন যেভাবে খেলেছে, সেটা ফুটবলের একটা সুন্দর প্রকাশ। বল দখল, দলীয় সমন্বয়, ব্যক্তিগত দক্ষতার সম্মিলন। আর আর্জেন্টিনা যেভাবে খেলেছে, সেটাও ফুটবলেরই অংশ। প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকা, মেসিকেন্দ্রিক আক্রমণ, শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা।
দুটোই ফুটবল। শুধু দুটো ভিন্ন দর্শন।
ফোলারের কথায় হয়তো বাড়াবাড়ি আছে। আর্জেন্টিনার খেলাকে ‘ফুটবল না’ বলাটা অনেকেই মানতে পারেননি। কিন্তু তার মূল বক্তব্য, জার্মান ফুটবলের নিজস্ব পরিচয় ফিরে পাওয়া দরকার, এটা সঠিক।
ইয়ামাল, রদ্রি, ওলমোদের স্পেন এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আর্জেন্টিনা রানার্সআপ। জার্মানি শেষ ষোলোতে বিদায়। এই বাস্তবতাই ফোলারকে এই কথা বলতে বাধ্য করেছে।
ফুটবলের বিতর্ক চলতে থাকবে। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ফোলারকে ছেড়ে কথা বলবেন না। কিন্তু স্পেনের ট্রফি এবং আর্জেন্টিনার শূন্য শটের পরিসংখ্যান ফোলারের পক্ষেই কথা বলে।
বিশ্বকাপের এই বিতর্ক মনে রাখুন। আর আসছে মৌসুমের ফুটবল উপভোগ করতে Jeta33-এর প্রমোশন পেজ দেখুন এবং ভিআইপি রিওয়ার্ড প্রোগ্রামে যোগ দিন।